• আপডেট টাইম : 19/11/2020 10:40 PM
  • 118 বার পঠিত
  • প্রকৌশলী মেহেদী হাসান তুষার
  • sramikawaz.com

বাংলাদেশ প্রতি বছর যদি ১ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিদেশে রপ্তানি করে তাহলে তার মধ্যে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিদেশেই চলে যায়। মানে ১০০ টাকার পোশাক রপ্তানি করে দেশে থাকে শুধু ৩০ টাকা। এ টাকার প্রায় পুরোটাই শ্রমিকের পারিশ্রমিকের টাকা। কখনো কখনো সামান্য বেশি, কখনো কখনো আরো কম!

কেন জানেন?
কারণ একটা জামা সেলাই করতে কাপড়, কাপড়ের কাঁচামাল, সূতা, বাটন, বাটনের কাঁচামাল, এক্সেসরিজ- পলি, কার্টুন সব কাঁচামাল বিদেশ থেকে আসে। অল্প সামান্য দেশে থেকে তৈরি হয়। যা মূল্য সংযোজনে সামান্য অবদান রাখে।
মূল্যসংযোজন কাকে বলে সে কথা বলি। মূল্য সংযোজন হলো-কাঁচামাল কেনার পর ওই কাঁচামাল দিযে পণ্য তৈরি করে যে বাড়তি দাম তৈরি হয় তাই মূল্য সংযোজন। আমাদের দেশে পোশাক তৈরিতে কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করে রপ্তানি করার কারণে মূল্য সংযোজন কম হয়।

আমরা যদি কোন পোশাকের অর্ডার ১০০ টাকা পিসে নেই তাহলে এর মধ্যে শুধুমাত্র মজুরির ৩০ টাকা আমরা পাই। বাকীগুলো মানে কাঁচামাল বিদেশে থেকে কিনতে গেলে ৭০ টাকা বিদেশেই চলে যায়। তবে নীট বা গেঞ্জি রপ্তানি ক্ষেত্রে এই মূল্য সংযোজন একটু বেশি। কারণ নীট তৈরি পোশাকের ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।

এখন আমাদের পুরোপুরি লভ্যাংশ অর্জন করতে নিটিং,ডাইং এবং এক্সেসরিস এর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আমাদের দেশেই আমরা যদি পুরোপুরি লÿ¶্যমাত্রা অর্জন করতে পারি, তাহলে দেশের টাকা দেশেই রাখা সম্ভব।

বিদেশীরা আমাদের দেশ থেকে পোষাক কেনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের মধ্যে একটা কারণ হলো সস্তা মজুরি। আমাদের দেশে একটা আইটেমের মজুরি যদি ১০ টাকা লাগে ভারতের লাগে ১৫ টাকা, শ্রীলঙ্কার ২০ টাকা, চায়নার ৩০ টাকা।
আপনারা যারা ব্যবসায়ী তারা ভালো করেই জানেন ব্যবসায় ১ টাকার কত গুরুত্ব! এই গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশ থেকে চাইলেও গার্মেন্টস সেক্টর রাতারাতি অন্য দেশে ট্রান্সফার করা সম্ভব না। মানে বিদেশীরা চাইলেও আমাদের দেশে অর্ডার না দিয়ে আরেক দেশে অর্ডার দিতে পারবে না।
বাংলাদেশ থেকে আরেকটা কারণে রাতারাতি গার্মেন্টস সেক্টর অন্য দেশে চলে যাবে না। কারণ কী জানেন?

কারণ হলো পানি!
হ্যাঁ, এই পানির জন্য এক সময় দুনিয়ায় বিশ্বযুদ্ধ হবে এখন যেমন তেলের জন্য হচ্ছে। এটা আমার কথা না। পরিসংখ্যানের কথা।

একটা অদ্ভুত কথা বলে নিচ্ছি। এক পিস পোষাকের জন্ম থেকে কাস্টমারের হাতে পৌছানো পর্যন্ত ১৯০ লিটার পানি লাগে! আপনি এত পানি কয়টা দেশে পাবেন?

আপনি চাইলেও যে কোনো পানি দিয়ে কাপড় সূতা ওয়াশ করতে পারবেন না, বানাতে পারবেন না। বাংলাদেশের পানিতে পিএইচ-এর মাত্রা যেটা আছে সেই মাত্রার পিএইচ অনেক দেশের পানিতে নেই। ভারতের অনেক রাজ্যে এখনো খাবার পানি সংকট, কাপড় বানানো দূরের কথা। মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা তো সবাই জানেন। সেখানে পানির চেয়ে তেলের দাম কম। তেল দিয়ে তো আর কাপড় বানানো-প্রসেস করা যাবে না। আমাদের মত ফ্রী পানি তারা পাবে না।

গার্মেন্টস শিল্প শুধুমাত্র গরিব দেশের ব্যবসা। ধনীরা এটা কখনো করবে না কারণ এতে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ হয়। বরং শ্রম ঘন এ ধরণের শিল্প উন্নত দেশ থেকে বিদায় করেছে।

এশিয়ার মধ্যে যারা গরিব দেশ তাদের বেশিরভাগ পানি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার সমস্যা। যেমন সব দেশে পোর্টই নেই। আর পোর্ট থাকলেও আমাদের মত নেই। আর নতুন কোন দেশে এই শিল্প গেলে সেখানকার লোকজন দ¶ হতে হলে মিনিমাম ১০ বছর লাগবে। সবচেয়ে বড় কথা দুর্নীতি দূর্নীতি না থাকলে এই শিল্প দাঁড়াবে না। দুর্নীতির সাথে গার্মেন্টস শিল্পের নিবিড় সম্পর্ক! এজন্য শুধুমাত্র ভিয়েতনাম ও আফ্রিকার কয়েকটা দেশে এই শিল্প ছড়িয়ে যাচ্ছে। তবে ছড়িয়ে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশের টেনশনের তেমন কিছুই নেই। চীনারা ধনী হয়ে যাচ্ছে, তারা পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হচ্ছে। তারা গার্মেন্টস শিল্প ছেড়ে দিচ্ছে এবং আফ্রিকা ও ভিয়েতনামে নিজেদের অর্ডারগুলোই প্রসেস করছে। এই যে বাংলাদেশ পর পর দুই বছর রপ্তানীতে ২য় থেকে ৩য় হলো তাতে কিন্তু আমাদের কোন অর্ডার কমে নাই বরং বেড়েছে। ভিয়েতনাম যে ৫ থেকে হঠাৎ করে ২য় হলো তাদের অর্ডার এসেছে চায়নার ফেলে দেয়া অর্ডার থেকে।

চায়না বিশ্বের ৭২% পোষাক বানায়। ২য় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ বানাত মাত্র ৮ বা ৯%
মানে চায়না যদি তার অর্ধেক অর্ডারও ছেড়ে দেয় তাহলে বাংলাদেশের মত ৫ টা ঘনবসতিপূর্ণ দুর্নীতিবাজ দেশ লাগবে। যে দেশে পানি থাকবে, পোর্ট লাগবে, চায়না থেকে কাঁচামাল আমদানীতে কম সময় লাগবে এবং রপ্তানিতে যথেষ্ট সুযোগ থাকা লাগবে। এগুলো ভিয়েতনামে একদিনে তৈরি হয়নি। মিনিমাম ২০ বছর লেগেছে এই অবস্থানে আসতে।


আমাদের দেশ বর্তমানে পোশাকশিল্পে অনেকটা এগিয়ে। সুতরাং বর্তমানে এই এগিয়ে থাকা অবস্থাকে আরও এগিয়ে নিতে সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকারের মনোযোগি হতে হবে। এজন্য দেশে ব্যাক ওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কম দামের তৈরি পোশাক থেকে ডিজাইন নির্ভর বেশি দামের তৈরি পোশাকে তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে। আরও বেশি সংখ্যক বাজার খুঁজে বের করেত হবে। বাজারের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জনের জন্য যে দক্ষতা লাগে তা সরকার ও উদ্যোক্তা মিলে করতে হবে। আর শুধু শ্রমিক ঠকিয়ে বেশি মুনাফা করার চিন্তা থেকে বের হয়ে এসে উদ্যেক্তাদের উচিত শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দেওয়া ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগি হওয়া। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে দ্বিতীয় প্রজন্মের মানুষেরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই দ্বিতীয় প্রজন্মের মানুষ অনেক আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক। তারা এ কাজটি আরও সুচারুভাবে করতে পারবে। তৈরি পোশাক শিল্প তথা রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে তা করবে আমরা সেই আশায় আছি।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...