• আপডেট টাইম : 15/11/2020 12:12 AM
  • 3441 বার পঠিত
  • এসএম আলমগীর
  • sramikawaz.com

আইন অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) করার কথা। গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন করোনার কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মন্দা যাচ্ছে। এ জন্য এ বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধি করা যাবে না। পাশাপাশি ৩ বছরের জন্য শ্রম আইনও স্থগিত চান গার্মেন্টস মালিকরা।


গার্মেন্টস খাতকে সঙ্কট চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে। করোনাভাইরাসের কারণে গত ৮ মাস ধরে ধুঁকছে দেশের রফতানি বাণিজ্যের প্রধান এই খাত। শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারছেন না। সরকারের দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পরিশোধের সময় চলে এসেছে, কিন্তু সেটিও এখন দিতে পারছেন না শিল্প মালিকরা। এরই মধ্যে যখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল শিল্পটি ঠিক তখনই এলো করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা। এখন নতুন সঙ্কট হিসেবে দেখা দিয়েছে শ্রমিকদের ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট।
শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিবছরের ডিসেম্বর মাসে শ্রমিকদের মজুরি নিয়মমাফিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এ সঙ্কটকালীন সময়ে শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের এই ইনক্রিমেন্ট দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। গার্মেন্টস মালিকদের শ্রম আইনের এই বিধান আগামী ৩ বছরের জন্য স্থগিত চেয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানাবেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা। তবে শ্রমিক নেতারা বলছেন, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট শ্রমিকদের আইনি অধিকার। এই অধিকার থেকে শ্রমিকদের কোনোভাবেই বঞ্চিত করা ঠিক হবে না।


এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সর্বশেষ ২০১৮ সালে যখন গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, তখন সেটিই আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে আমরা সে মজুরি মেনে নিয়েছিলাম, কিন্তু ওই মজুরি দেওয়ার মতো সামর্থ্য শিল্প মালিকদের ছিল না। তখনই বলা হয়েছিল, এখন থেকে প্রতিবছর শ্রমিকদের মজুরি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। গত দুই বছর সেটি কষ্ট হলেও মালিকরা দিয়েছেন, কিন্তু এ বছর ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া শিল্প মালিকদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। করোনার কারণে গার্মেন্টস শিল্প ভালো নেই, মালিকরাও ভালো নেই। তাই আমরা আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই শ্রম মন্ত্রণালয়ে ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির বিধান অন্তত ৩ বছরের জন্য স্থগিত চেয়ে আবেদন জানাব। একই সঙ্গে এই আবেদনের অনুলিপি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের কাছে পাঠাব, যাতে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে।


তবে শ্রমিক নেতারা মালিকদের এই সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করছেন। এ বিষয়ে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিকলীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, প্রতিবছর ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের আইনি অধিকার। এই অধিকার থেকে মালিকরা শ্রমিকদের বঞ্চিত করলে সেটি মোটেই ঠিক হবে না। আইনে আছেÑএটি দিতেই হবে। কারণ করোনার কারণে গার্মেন্টস মালিকরা যেমন সমস্যায় আছে, তার চেয়ে বেশি সমস্যায় আছে শ্রমিকরা। তারা যা বেতন পান তা দিয়ে এই দুঃসময়ে চলা কঠিন। তাই ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। মজুরি বৃদ্ধি না করলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে, তখন এর দায় কে নেবে। তাই মালিকদের এই সিদ্ধান্ত আমরা মানতে পারছি না।


আট মাস ধরে ধুঁকছে গার্মেন্টস শিল্প : বাংলাদেশে করোনার আঘাত হানে গত ৮ মার্চ। এরপর ২৫ মার্চ থেকে দেশ ৬৩ দিনের লকডাউনে চলে যায়। করোনার শুরুতেই যে কয়টি খাতে সবার আগে ধাক্কা লাগে তার মধ্যে শীর্ষে ছিল গার্মেন্টস শিল্প। পোশাকের রফতানি আদেশ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পুরনো আদেশগুলো বাতিল হয়ে যায়। সবমিলে গত ৮ মাসে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয় গার্মেন্টস শিল্পে। সঙ্কটে পড়ে কয়েকশ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়েছে দেড় লাখেরও বেশি শ্রমিক। এ সঙ্কট থেকে এখনও বের হতে পারেনি গার্মেন্টস শিল্প।


এ বিষয়ে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি আরশাদ জামাল দিপু বলেন, গার্মেন্টস শিল্প এখন রীতিমতো ধুঁকছে। এ খাতের উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক কেউই ভালো নেই। এ জন্য মালিক-শ্রমিক উভয়কেই এখন ছাড়ের মনোভাব দেখাতে হবে। শিল্পটি যাতে টিকে থাকেÑসেটিই এখন আমাদের প্রধান ল¶্য হওয়া দরকার। এ জন্য সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। করোনার শুরু থেকে সরকার এ শিল্পের জন্য অনেক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, সামনের দিনগুলোয় সরকারের এ সহযোগিতা আমাদের আরও বেশি দরকার হবে।


প্রণোদনার ঋণ পরিশোধ ও নতুন ঋণের আবেদন
করোনার শুরুতেই শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল দেয়। এটি শিল্প মালিকরা ঋণ হিসেবে নিয়ে শ্রমিকদের বেতন দিয়েছেন। এরপর সরকার বৃহৎ শিল্পের জন্য যে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সেখান থেকেও গার্মেন্টস মালিকরা ঋণ নিয়েছেন। এ খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ যেমন বেশি পেয়েছেন, তেমনই তাদের সুদও দিতে হয়েছে নামমাত্র। তিন দফায় সরকারের দেওয়া মোট ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা পেয়েছেন তারা। এই ঋণের টাকা দুই বছরের মধ্যে পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল এবং ঋণ পরিশোধ করার সময়ও শুরু হয়ে গেছে চলতি নভেম্বর মাস থেকে। কিন্তু গার্মেন্টস মালিকরা এখন এই ঋণ পরিশোধে গড়িমসি শুরু করেছেন। তারা দুই বছরের বদলে পাঁচ বছর সময় চান ঋণ পরিশোধের জন্য। এ নিয়ে সরকারের কাছে লিখিতভাবে আবেদনও করেছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সম্প্রতি সংগঠন দুটির প¶ থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এর অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে।


শুধু তাই নয়, আরও ৩ মাসের বেতন পরিশোধের জন্য নতুন করে ৭ হাজার কোটি টাকা চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন দিয়েছে মালিকদের ওই দুই সংগঠন। মাস খানেকেরও বেশি সময় হয়ে গেল, কিন্তু নতুন করে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের প¶ থেকে তেমন একটি সাড়া পাচ্ছেন না গার্মেন্টস মালিকরা।


এ বিষয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা এখনও ¶তি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরই মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা আসছে। ইতোমধ্যে ইউরোপের দেশগুলো আবারও লকডাউনে যাচ্ছে। ফলে আমাদের ¶তি যে কোথায় গিয়ে থামবে, তা আমরা কেউ জানি না। সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে ঋণ পরিশোধের জন্য নিশ্চয়ই আমাদের পাঁচ বছরের সুযোগ দেবে, একই সঙ্গে নতুন করে যে ঋণ চাওয়া হয়েছে আশা করব সরকার সেটিও বিবেচনায় নেবে।


করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা
শীতের আগমনে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছে সারা বিশে^। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের পোশাক খাতে। এরই মধ্যে কোনো কোনো ক্রেতা উৎপাদন শুরু না হওয়া ক্রয়াদেশ আপাতত স্থগিত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। আবার কিছু ক্রেতা তাদের আউটলেট বা দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য মেইলে জানিয়ে দিচ্ছেন।


পোশাক মালিকরা বলছেন, খাতটিতে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব মধ্য নভেম্বরে স্পষ্ট বোঝা যাবে। তবে অক্টোবরের মতো আগামী মার্চ পর্যন্ত পোশাক রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রবণতা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।


করোনার প্রভাবে গত মার্চ থেকে পোশাক খাতের রফতানি কমতে শুরু করে। এপ্রিলে যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এবং মে মাসেও তা অব্যাহত ছিল। তবে জুন থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে পোশাক খাত। এর ধারাবাহিকতা জুলাই, আগস্ট এমনকি সেপ্টেম্বরেও অব্যাহত ছিল। তবে অক্টোবরে শেষে এ খাতের আয় হোঁচট খায়।


ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ হাজার ৪৫ কোটি ডলার। যা ল¶্যমাত্রার চেয়ে দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতের আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৭ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। শিল্প মালিকরা আশায় ছিলেন, ডিসেম্বরে থেকে ঘুরে দাঁড়াবে পোশাক শিল্প, কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় সেটি আর হচ্ছে না। এখন আবার বিদেশি ক্রেতারা রফতানি আদেশ বাতিল করে দিচ্ছে।


শিল্প মালিকরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামলানো কঠিন হবে গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য। সময়ের আলো

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...