• আপডেট টাইম : 03/11/2020 10:47 AM
  • 21 বার পঠিত
  • মাহফুজ আনাম
  • sramikawaz.com

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুনপ্রতিশ্রুতি, আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। কিন্তু, তার এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বিশেষত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনটি যেভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তার কী সামঞ্জস্যতা আছে?

নীতিহীন ও হলুদ সাংবাদিকতা থেকে দূরে থাকার এবং দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের সঙ্গে আমরা অবশ্যই একমত পোষণ করি। বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, ‘নীতিহীন রাজনীতির মতো, নীতিহীন সাংবাদিকতাও সমাজে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।’ তার এই কথার সঙ্গেও আমরা সম্পূর্ণ একমত।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন আমরা প্রশ্ন তুলি: ‘নীতিহীন’ সাংবাদিকতা কোনটি এবং এই সিদ্ধান্ত কে নেয়? ‘জাতীয়’ এবং ‘জনগণের’ স্বার্থ কোনটি এবং সেই সিদ্ধান্ত কে নেয়? ‘জনগণ’ নাকি ‘ক্ষমতা’?

প্রধানমন্ত্রী আমাদের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিকে বিভ্রান্ত করতে পারে এমন কোনও সংবাদ পরিবেশন না করে ‘গঠনমূলক সমালোচনা’ করতে। গঠনমূলক সমালোচনা নিয়ে অংশীজনের অংশগ্রহণে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন। কোন পর্যন্ত সরকারের সমালোচনা করা ‘গঠনমূলক’ হবে এবং সমালোচনা কখন ‘বিভ্রান্তি’ ছড়াতে শুরু করে?

একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত সরকার যেকোনো উপায়ে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য তার সব শক্তি এবং প্রভাব ব্যবহার করে। এমনকি এর জন্য কখনও কখনও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি শিথিল করা হয় এবং আইনি ব্যাখ্যাও পরিবর্তন করা হয়। সেসময় ‘জনগণের স্বার্থে’ একটি গণমাধ্যমের কী করা উচিত?

রাজনীতিবিদদের কাছে জাতীয় স্বার্থ এবং দলীয় স্বার্থ প্রায় একই রকম দেখায় (আমরা এমন একটিও উদাহরণ দেখতে পাই না যে জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী হয় বলে কোনো রাজনীতিবিদ তাদের নিজের দলের বিরোধিতা করেছেন। আমাদের দেশের রাজনীতির প্রকৃতি বিবেচনায়, এমনটি হতেই পারে না)। তাদের কাছ থেকেই আমরা অভিযোগ শুনতে পাই যে আমরা জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করছি। যেখানে বাস্তবতা হলো- আমরা শুধু দুর্নীতি ও অপরাধের চিত্র তুলে ধরছি। যখন ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ আলোচনায় আসে, তখন এমন কিছু হয়ে থাকলে আমরা মাথা নিচু করে এবং বিনীতভাবে তার দায়ভার গ্রহণ করি। একই ভাবে আমরা ভিত্তিহীন, অপ্রাসঙ্গিক এবং সম্পূর্ণ মিথ্যাচারমূলক ‘হলুদ সমালোচনা’র বিষয় নিয়েও আলোচনা করতে পারি। যখন বিস্তারিত অনুসন্ধানমূলক কোনো প্রতিবেদন এবং তথ্য-ভিত্তিক কোনো সম্পাদকীয়কে হলুদ বলে আখ্যা দেওয়া হয় তখন তাকে ‘হলুদ সমালোচনা’ বলে আখ্যায়িত করাই সমীচীন।

ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, সম্পদের অপব্যবহার এবং নাগরিকদের তাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা প্রকাশে গণমাধ্যম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এটি গণমাধ্যমের দায়িত্ব। সরকার যখন কোনো কাজ করার দাবি করে, তখন একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে না। আর তা হলো— জনগণের অর্থ দিয়েই সরকার সবকিছু করছে। যখন একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যয় ধার্য করে কাজ শুরু করা হয় এবং বারবার কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় তখন সেই অর্থ ‘আমরা জনগণ’ প্রদান করি। তাই, জনগণের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে তা খুঁজে বের করতে এবং প্রকাশ করতে গণমাধ্যম বাধ্য। প্রায়শই দেখা যাচ্ছে, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানেনই না যে কীভাবে জনগণের অর্থ নষ্ট করা হচ্ছে, পাচার করা হচ্ছে কিংবা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। গণমাধ্যমে সেগুলো প্রকাশ করা হলে তবেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা না হলে এই জাতীয় ঘটনাগুলো কখনো হয়ত সামনেই আসতো না।

বাংলাদেশের মূলধারার অধিকাংশ গণমাধ্যম পেশাদারিত্বের নৈতিক মানদণ্ডগুলো সাধারণত অনুসরণ করে। কিন্তু যদি কোনো খারাপ উদাহরণ সামনে এসে যায় তখন সেটা দেখিয়ে পুরো গণমাধ্যমকে দোষী করা হয়। আমরা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ইত্যাদির সমর্থনে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছি। জনগণ ও সরকারের প্রতিটি সাফল্য আমরা প্রচার ও উদযাপন করেছি। গণমাধ্যম জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য উদাহরণ দেখানো সম্ভব না।

সরকার এবং গণমাধ্যমের কাছে ‘জাতীয়’ বা ‘জনসাধারণের’ স্বার্থের উপলব্ধি বা সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যার পার্থক্যটা ঐতিহাসিক। কিছু উদাহরণ দিলে এটি সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

১৯৬১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি পিগ উপসাগরে সেনা অবতরণ করিয়ে কিউবা আক্রমণ এবং কাস্ত্রোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমস বিষয়টি জেনে যায় এবং প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি নেয়। কথিত আছে, প্রেসিডেন্ট কেনেডি ব্যক্তিগতভাবে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদককে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করে বলেন, এ প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে জাতীয় স্বার্থ এবং আমেরিকান সেনাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদক তখন তাকে বলেন, কিউবায় আক্রমণ করা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। একটি অবৈধ যুদ্ধ চালিয়ে আমেরিকানদের জীবন হুমকির মুখে ফেলছে প্রশাসন, পত্রিকা নয়। প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়েছিল এবং কিউবা আক্রমণের অভিপ্রায় চরম ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে এই প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য কারাবন্দী করা হয়নি বা নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাও করা হয়নি। অনেক ছোট-খাটো বিষয়কেও আমাদের এখানে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে পেন্টাগনের কিছু গোপন নথি প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। এটিও ‘জাতীয় স্বার্থ’ সংজ্ঞায়িত করার আরেকটি উদাহরণ। জোর করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধ করার ক্ষমতা মার্কিন সংবিধান সেদেশের সরকারকে দেয়নি। দেশটির সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে সেখান থেকে তাদের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। (এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় সহযোগিতার একটি অনন্য উদাহরণ। বিচার বিভাগ স্বাধীন গণমাধ্যমকে সমর্থন না দিলে সরকারের আক্রোশ থেকে মুক্ত থাকা খুবই কঠিন। আরও দুটি উদাহরণ দিয়ে এটি পরিষ্কার করা যায়। ট্রাম্প প্রশাসন গণমাধ্যমকে বিদ্রূপ করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু দেশটির আদালত তাকে বাধা দিয়েছে। কিন্তু, মিশর, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারসহ অনেক দেশেই আদালত গণমাধ্যমের নিরাপত্তায় এ জাতীয় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।)

দক্ষিণ এশিয়ায় নৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান উদাহরণ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। ১৯৭১ সালে তার সাংবাদিকতার উদাহরণটি অনন্য হয়ে আছে। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আরও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে তাকেও পূর্ব পাকিস্তান সফর করাতে নিয়ে আসে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী কীভাবে ‘বাঙালি বিশ্বাসঘাতক’দের হাত থেকে ‘পাকিস্তানকে বাঁচাতে’ লড়াই করছে তা দেখানো এবং সে সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করা। ফিরে গিয়ে অন্যান্য সাংবাদিকরা সেনাবাহিনীর গুণগান করেন। কিন্তু অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ভিন্ন পথে হাঁটেন। বাঙালিদের ওপর চলা গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ তিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। (এর জন্য তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল)। তিনি তার নিজের দেশের ‘জাতীয় স্বার্থে’র বিরুদ্ধে যান। সানডে টাইমসের মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেন যে তার নিজের সেনাবাহিনী হত্যাযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবেদনটি নাটকীয়ভাবে পুরো বিশ্বে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য রেপ অব বাংলাদেশ’ বইটি মানবতাবিরোধী অপরাধ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক অবদান রাখে।

আমদের যাদের বেশ বয়স হয়েছে, তৎকালীন পাকিস্তানে জীবনের একটি অংশ পার করেছি তারা দেখেছি, আমাদের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, সাংস্কৃতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অধিকারে অংশীদারিত্ব এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ধারাবাহিক এবং অবিশ্বাস্যভাবে গণমাধ্যম কতটা ভূমিকা রেখেছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা যায় তাহলে তৎকালীন সেই গণমাধ্যম এবং অক্লান্ত পরিশ্রমী সাংবাদিকরা ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ’ করা এবং জনগণকে ‘বিভ্রান্ত’ করার দায়ে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সহজেই অভিযুক্ত হতে পারতেন।

আসুন আমরা ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের’ মিডিয়া কাভারেজ বিবেচনা করি। আমরা যারা দাবিটির যথার্থতা বুঝতে পেরেছি এবং প্রতিবেদন, কলাম ও সম্পাদকীয়র মাধ্যমে সমর্থন করেছি, বিএনপি সরকারের বিবেচনায় তা সংবিধানবিরোধী বলে বিবেচিত হতো (যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি আমাদের সংবিধানে ছিল না)। তখনকার সরকারের হিসেবে এটি ছিল ‘সরকার বিরোধী’, ‘জাতীয় স্বার্থ’ বিরোধী এবং জনসাধারণকে ‘বিভ্রান্ত’ করার একটি প্রচেষ্টা।

বিএনপি সরকারের একাধিকবারের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান বিরোধী দলে থাকাকালীন এক কূটনৈতিক সংবর্ধনায় দেখা হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে ‘জাতির বিবেক রক্ষক হিসেবে’ উল্লেখ করেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর একই রকম আরেকটি আয়োজনে দেখা হলে তিনি আক্ষরিকভাবেই চিৎকার করে বলেন ‘সরকারের শত্রু এসে পৌঁছল’। আমি বিনীতভাবে তাকে জবাব দিয়েছিলাম, ‘সাইফুর ভাই, আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি, আপনি বেড়ার একপাশ থেকে অন্য পাশে চলে এসেছেন এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আপনার মতামত একেবারেই বিপরীত হয়ে গেছে।’

আমি এই স্মৃতিচারণ করলাম শুধু এটাই বলার জন্য যে ‘ক্ষমতায় থাকা আর না থাকা’র ওপর ভিত্তি করে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর ধারণার পরিবর্তন হয়। বিরোধী দলে থাকলে, একটি স্বাধীন গণমাধ্যম হলো ‘বিবেক’ এবং ক্ষমতায় থাকলে ‘শত্রু’। আমরা এর কোনটিই নই। আমরা শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি এবং নৈতিকতা থেকে আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছি।

‘নীতিহীন’ সাংবাদিকতার বিষয়ে ফিরে আসি। অবশ্যই এটি এমন একটি বিষয় যা থেকে আমাদের পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে এবং মনেপ্রাণে একে ঘৃণা করতে হবে। তবে প্রায়শই সাংবাদিকতাকে অনৈতিক হিসেবে অভিহিত করা হয় কারণ এটি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয় বা সরকারের দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে। জনগণকে ‘বিভ্রান্ত’ করার দায় আমাদের দেওয়া হচ্ছে কারণ আমরা সরকারি ভাষ্যে কথা বলছি না এবং সরকারি ব্যাখ্যার সঙ্গে সহমত পোষণ না করে, সাংবাদিকতার নীতির প্রতি অবিচল থেকে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আমাদের অভিযুক্ত করছে আমরা ‘জনগণের স্বার্থ‘ দেখছি না।

সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্টদের ব্যর্থতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— তারা কখনও সরকারি ভাষ্য বা ব্যাখ্যার বিপক্ষে কাউকে কথা বলতে দেয়নি। ফলস্বরূপ তারা বুঝতেই পারেনি যে তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ৭০ বছর বয়সী একটি ব্যবস্থা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। আমার মতে, মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অনুমতি না দেওয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সে সময়ের ব্রেজনেভস এবং কোসিগিনরা জানতেন না যে তাদের সরকার কতটা দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল এবং জনগণ তাদের কতটা সমর্থন করছে। এর কোনটিই তারা জানতে পারেনি স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকার কারণে।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়ে স্পষ্টতই বুঝতে পারি তিনি পত্রিকার সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তিনি এই পেশার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সম্প্রতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের একটি লেখায় খবরের কাগজের সঙ্গে তার বড় হওয়ার গল্প তুলে ধরা ধরেছেন। আমরা তার লেখাটি প্রকাশ করেছি। সাংবাদিকতার প্রতি একটি অন্তর্নিহিত শ্রদ্ধা বঙ্গবন্ধু-শেখ হাসিনা দুজনের লেখাতেই সুস্পষ্ট।

আমরা প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে আমরা একই ধারাতেই রয়েছি। তবে পার্থক্য এটুকুই যে তিনি এখন আমাদের ইতিবাচক এবং সমালোচক উভয় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।

তার তরুণ্যের সময়ে সাংবাদিকতার ফোকাস ছিল কেবল আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের দিকে। জনগণের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও এই লক্ষ্য ছিল একেবারেই পরিষ্কার। তখনকার দাবি ছিল ত্যাগের, প্রয়োজনে জীবনসহ সব কিছু উৎসর্গের।

তখন তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। এখন তিনি সরকার প্রধান। সংজ্ঞা অনুসারে তিনি অত্যন্ত জটিল ও বিস্তৃত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং এটি পরিচালনা খুবই দুরুহ কাজ। বিশেষত আমাদের দেশ অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মাঝে থাকায় তা আরও বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। আজকের দিনে সাংবাদিকতা ফোকাস করেছে জাতি গঠনে। যার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে- গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, অধিকার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন।

ওপরের কোনওটিই স্বাধীন এবং নৈতিক গণমাধ্যম ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব না। মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার বৈশ্বিক আইকন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল্টার ক্রোনকাইট বলেছেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গই কেবল নয়, এটিই গণতন্ত্র।’

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার
সূত্র ডেইলি স্টার বাংলা

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...