sa.gif

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র শ্রমিকদের পাশে আছে
মো. ইদ্রিশ আলী





(পূর্ব প্রকামের পর)


(প্রিয় পাঠক ও সহযোদ্ধা বন্ধুরা, সম্পূর্ণ লেখাটাই আমার স্মৃতির্নিভর তাই কোন কোন বিষয় বাদ যেতে পারে। সেটা আমার ইচ্ছাকৃত নয়। যাদের ঐকান্তিক চেষ্টা আজকের গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। তাদের মধ্যে কেউ লেখাটি পড়ে থাকলে এবং তাদের কাছে কোন তথ্য থাকলে তা জানালে লেখাটা আরো পুর্ণতা পাবে।)

শুরু থেকে সুনির্দিষ্ট দাবি-দাওয়া ভিত্তিক মিছিল মিটিং কর্মিসভা করার মাধ্যমে অতি অল্প সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের প্রিয় সংগঠনে পরিনত হয় গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। আমরা যেসকল দাবি ঠিক করি তারদিকে নজর দিলে বুঝতে পারবেন গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের কি রকম অত্যাচার নির্যাতনের মধ্যে কাজ করতে হয়। কেন গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য আলাদা সংগঠনের প্রয়োজন। দাবি সমূহ- নিয়োগপত্র দিতে হবে, আট ঘন্টা কাজ, অতিরিক্ত কাজের জন্য দ্বি-গুণ মজুরি দিতে হবে, সাপ্তাহিক ছুটি দিতে হবে, মাতৃত্ব কালিন সবেতন ছুটি দিতে হবে, ন্যায্য মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে।

শত অত্যাচার নির্যাতনের মধ্যেও শ্রমিকরা কথাবলার সাহস পেত না। কারন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর মত দৃশ্যমান কোন সংগঠন ছিলনা। যদিও নামকাওয়াস্তে অনেক সংগঠন তখন বিদ্ব্যমান ছিল। শ্রমিকদের সংগঠিত করে দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলার দিকে তাদের মনযোগ ছিলনা। নিজেদের আখের গোছাতেই তারা ব্যস্ত ছিল। তাই যখন আমরা এই সকল দাবি নিয়ে শ্রমিকদের মাঝে প্রচার প্রচারনা শুরু করি তাদের সাথে বৈঠক করি, তখন শ্রমিকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। তারা ভরসার একটি জায়গা পায়।

এর ফলে শ্রমিকরা ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হতে থাকে। তারি বর্হিঃপ্রকাশ দেখতে পাই ৯৮ সালের মেদিবসের দিন। সে সময় সরকারি ছুটি থাকলেও গার্মেন্টস শ্রমিকরা তা ভোগ করতে পারতো না। তেজগাঁওয়ে সকল কারখানায় প্রতি দিনের মত কাজ শুরু হয়। আমরা সাত জন ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে মিছিল করার জন্য। ভাবছি এই ক’জনে কিভাবে মিছিল শুরু করি। আজিজ সুপারের সামনে থেকে আরো ৪/৫জন লোডিং শ্রমিক এসে আমাদের সাথে যোগ দিল। এ কয়জন আজিজ সুপারের মোড় থেকে মিছিল করে সামারেজা ব্লেড কারখানার সামনে দিয়ে গুলশান লিংক রোডে উঠতেই আশে-পাশের সকল কল কারখানা বন্ধ করে হাজার হাজার শ্রমিক মিছিলে সাথে যুক্ত হতে থাকে। হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে এসে তাতের এতোদিনে জমে থাকা বঞ্চজনা ক্ষোভের র বহিঃপ্রকাশ ঘায়। যা আমাদের পক্ষে সামলানো সম্ভবপর হয়নি।


লুলাইড মুভমেন্ট এর গল্প আমরা জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছ থেকে শুনেছি। সেদিন যা দেখলাম সেই আন্দোলনের নতুন পথ দেখালো গার্মেন্টস শ্রমিকদের। যদি শ্রমিকদের কারখানাতে সংগঠন করার সুযোগ থাকতো কথা বলতে পারতো তাহলে হয়তো শ্রমিক রাস্তাতে এভাবে বিক্ষোভ দেখাতো না। আমারা যে চিন্তা থেকে এলাকা ভিত্তিক সংগঠন করার কথা ভেবেছিলাম তার যৌক্তিকতা আবার সঠিক বলে প্রমান করলো।


সেই দিনের আন্দোলেনের পর গার্মেন্টস শ্রমিকরা মে দিবসসহ সকল সরকারি ছুটি শ্রমিকরা ভোগ করার অধিকার পেল। যা আগে তা ভোগ করতে পারতো না। হাতে গোনা কিছু কারখানায় যদিও তারপরও মে দিবসে খোলা রাখতো।
তেজগাঁওয়ের প্রতিটি কারখানায় সংগঠন ছিলো। যতগুলি আন্দোলন তেজগাঁওয়ে হয়েছে সকল আন্দোলনে গার্মেন্ট শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন্ কেন্দ্রের কোন না কোন ভাবে যোগাযোগ ছিল। অনেক নেতা-কর্মী বের হয়ে আসছে সেই সব আন্দোলনের মধ্যেদিয়ে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ থেকে গেছে, আবার অনেকে বিভিন্ন যায়গায় চাকরি নিয়ে চলে গেছে। মাঝে মাধ্য অনেকেই ফোনে খোঁজ-খবর নেয়। বলে ‘আমাকে চিনতে পারেন? আমি তেজগাঁও সংগঠন করতাম।’ অনেকেই পেশা বদল করে এলাকাতে ছোট ব্যবসা করছে।

কিছুদিন আগে দেখলাম প্রথম দিকের কর্মী জাবেদ চায়ের দোকানদার হয়েছে। আকলিমা আক্তার থাকে টংগি দরজির কাজ করেন। শ্রমিক আওয়াজের সম্পাদক জাফর ভাই তিনিও তেজগাঁও এ থাকাকালিন সময়ে সংগঠনের সাথে ছিলেন। তার তেজগাঁও এর নাখাল পাড়ার মেসে কত মিটিং করেছি। জাফর ভাই ইষ্ট ওয়েষ্ট গার্মেন্টস চাকরি করতেন। পরে বেক্মিকোতে চাকুরি নিয়ে চলে যান আশুলিয়ায়। তখন তিনি থাকতেন বাইপাল ব্রীজের কাছে জ বসুন্ধরার একটি মেসে। সেখানে চাকরি করা কালিন তারই মাধ্যমে আশুলিয়াতে আ.ছালামের সাথে পরিচয়। যা পরবর্তিতে আশুলিয়ায় সংগঠন গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
তেজগাওঁ এ থাকাকালিন যে সব শ্রমিক আন্দোলন সংগ্রামের সাথী ছিল তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে সেই সব এলাকায় শ্রমিক নিয়ে কাজ করার একটি লিঙ্ক তৈরি হয়।

অনেকে বিদেশ চলে গেছে। সেখান থেকে ফোন করে সংগঠনের খবর নেয়। কে কেমন আছি জানতে চায়। আমরা যেসময় শুরু করি তখন অন্য কোন সংগঠনের অস্থিত্ম ছিলনা। আজ তেজগাঁওয়ে অন্য সংগঠন আছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অবস্থান নেই। মনে বড় কষ্ট পাই ।


পদ্ম, নাসা, এ্যাসোসিয়েট, হাউজ অফ সানসাইন ফ্লোরেড-কোন আন্দোলনে আমরা ছিলাম না? নাসায় ইফতারির টাকা বাড়ানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় মর্জিনা। মর্জিনার মা এ্যাসোসিয়েট গার্মেন্টস কারখানায় মহিলা চেকারের চাকরি করতেন। আর মর্জিনা ছিলেন হেলপার। তখন থেকে চিনি মর্জিনাকে। বয়স হবে ১০/১২ বৎসর। মর্জিনা আমাকে কাকা ডাকতো। আমিও তাকে মেয়ের মত আদর করতাম। এ্যাসোসিয়েটের আন্দোলনে সে দেখেছে। সেই মর্জিনা অপারেটর হয়ে নাসাতে অপারেটার চাকরি নেয়। ইফতারির আন্দলনের সে ভূমিকা রাখে। জরুরি আইনে মামলা হয় ঈদের আগের দিন তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এমনি অসংখ্য নেতা কর্মি তৈরির হয়েছিল সে সময়। তারা ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন এলাকাতে।


তেজগাঁও এর আন্দোলনের কথাতে আসি। ১৯৯৯ সালের কথা। শ্রমিকরা কিছুটা সচেতন যেমন হয়েছিল, তেমনি মালিকরা সতর্ক হয়েছিল শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপারে। আমরা কারখানার গেটে যতটা যেতাম তার চেয়ে বেশি শ্রমিকের মেসগুলোতে যেতাম। ছুটির দিনে বেগুনবাড়িয়া, কুনিপাড়াসহ বিভিন্ন শ্রমিক বসতিগুলোতে বের হতাম। রতন ভাই বের হতেন নাখাল পাড়া থেকে। আমিও হাজির হতাম পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। এ সময়ে ডলির দর্জির দোকান, চিনা-ফ্যাক্টরির মোড়, তেজগাঁও রুরিং মিলের বটতলা বটতলা ,পেপসির গলিতে অসি সেন্টারে পরিনত হয়েছিল। এবং তেজগাঁও এর মরণ আলী রোডে অফিস নেয়ার আগ পর্যন্ত এই সকল সেন্টার ধরে সংগঠনরে কাজ হতে থাক। সে সময় থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শ্রমিকদের অন্য এলাকাতে কাজ থাকলেও তেজগাঁও এর মেস গুলোতে থাকা চাইই চাই।


গার্মেন্টস শ্রমিকদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি আমরা তেজগাঁও এর পুরাতন শ্রমিক নেতাদের খুঁজে বের করতাম। রুরিং মিলের শ্রমিক নেতা শ্যামলাল দাস, আনসি ,ইলিয়াস- এঁরাও সহযোগিতা করে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ইউনয়িন কন্দ্রে গঠনে। পরে ইলিয়াস গার্মেন্টস শ্রমিক হয়ে সংগঠনরে সাথে সরাসরি যুক্ত হয়।


রি-রুলিং মিলসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের মেসে যেতাম এ জন্য কোন কোন দিন অনেনক রাত পর্যন্ত এ মেস থেকে অন্য মেস, এ শ্রমিক কলনি থেকে অন্য কলনিতে হাটতে হতো।

এ সময়ে বর্তমান কার্যকরি সভাপতি শামীম ভাই যুক্ত হন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাথে। ১৯৯৮ সালের দিকের কথা। তেজগাঁও এর এখান যেখানে আহসানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত তার কাছে ফুটপাতে মালেক ভায়ের একটি রিক্সা গ্যারেজ ও খাওয়ার দোকান ছিল। সেখানেই মালেক ভায়ের কাছে যেতাম। এই যাওয়াটাই ছিল কোন না কোন শ্রমিককে খুঁজে বের করা। না হয় নতুন একজনের সাথে পরিচয় হওয়া। এভাবেই শামীম ভায়ের সাথে পরিচয় হয়। শামীম ভাই র্উমি গার্মেন্টস কারখানাতে কাজ করতেন। শামীম কারখানা ছুটির পরে সেখানে আড্ডা দিতেন। সেখানে থাকতো শামীমের সাথে পরিচয়। তাকে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাথে যুক্ত করার জন্য যখন সময় পেতাম তার বাসায় বা কারখানার সামনে বা মালেক ভায়ের দোকানে গিয়ে শামীমের সাথে কথা বলতাম। এবং যতক্ষন পর্যন্ত শামীমকে না পেতাম, বসে থাকতাম। তারপর তাকে সঙ্গে করে রতন ভাইসহ মিটিং বা অন্য শ্রমিক কলনীতে যেতাম। এভাবে সংগঠনের সাথে যুক্ত হন শামীম ভাই। ।


২০০০ সালের দিকে বর্তমান শ্রমিক আওয়াজ এর সম্পাদক জাফর ভাই আমাদের সাথে যুক্ত হয়। সে সময় জাফর ভাই অলটার নামে একটি অনিয়মিত কাগজ বের করতেন। তার তিনি আগে ইস্ট-ওয়েস্ট গার্মেন্টস কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার চেষ্টা করে বহিস্কার হন। এরপর কয়েকজন মিলে 'গোপনে ‌'অলটার নামে ওই অনিয়মিত কাগজ বের করছিলেন। নাখালপাড়ার শ্রমিক মেসে যাওয়ার সুবাদেই তার সাথে পরিচয় হয়। আমাদের সাথে তার যোগাযোগ হওয়ার পর রতন ভাই ‘অলটার‘ নামে কাগজ প্রকাশ করার বিষয়টিতে জানতে আগ্রহী হন। কিভাবে কোথায় সেটা বিক্রি করে, কোন চিন্তা থেকে অলটার নাম দিয়েছিল ইত্যাদি। জাফর ভাইও ছুটির দিনগুলোতে আমাদের সাথে শ্রমিক কলনীতে শ্রমিকদের মেস-বৈঠকে থাকতেন।

ইতিমধ্যে আমরা কেন্দ্রীয় ভাবে সংগঠন গোছানোর দিকে মনযোগ দিলাম। বিশাল একটা সেক্টরে ত্রিশ লক্ষের বেশি শ্রমিক। এত বড় সেক্টরে নেতৃত্ব দেওয়ার মত যোগ্য নেতা শ্রমিকদের ভেতর থেকে গড়ে উঠতে সময় লাগব। সে বিবেচনা করে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিকভাবে প্রশিক্ষিত করার জন্য প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়। কখন মঞ্জুরুল আহসান খান, শহিদুল্লাহ চৌধুরি,এমএম আকাশ, মালেক ভাই, কাফি রতন ভাই উপস্থিত থেকে শ্রমিকদের ক্লাশ নিতেন। যত ক্ষন পর্যন্ত না শ্রমিককের মধ্যে থেকে নেতা তৈরি না হচ্ছে ততক্ষন সংগঠনকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সাবেক ছাত্র নেতাদের সংগঠনের সাথে যুক্ত করা হয়। এর জন্য কাফি রতন ভাই অগ্রনি ভুমিকা রাখেন।

মঞ্জুরুল আহসান খান, শহিদুল্লাহ চৌধুরি ও মালেক ভাই এর মত শ্রমিক নেতা। এমএম আকাশ ভাই এর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কাফি রতনের মত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা মানুষ যখন শ্রমিকদের ক্লাস নিতো শ্রমিকরা রাজনৈতিক চেতনায় শানিত হতো, উজ্জীবিত হোত। এ সময়ে শ্রমিকদের আদর্শিকভাবে গড়ে তোলার কাজটি হয়।

১৯৯৮ সালের শেষের দিকে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় আহবায়ক কমিটি গঠিত হয়। আমাকে করা হয় আহবায়ক। পরের বছর এটি রিফর্ম ও বড় পরিসরে আয়বায়ক কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটিতে যুগ্ম আহবায়ক হিসাবে আসেন ছাত্র নেতা আসলাম খান। ওই আহবায়ক কমিটিতে ডলিসহ সহ অনেকে ছিলেন। আসলাম ভাই তখন পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতেন। আরো অনেকেই ছিলেন সে কমিটিতে। অনেকের নাম মনে করতে পারছিনা। তেজগাঁওয়ে হাসান এন্ড হাসান ও রসুল বাগের সুয়েটার কারখানার আন্দোলনে আসলাম ভাই উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখেন । (চলবে)

 






Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution