sa.gif

শ্রমিক শিকলবন্দি- কতটা দায়ী পশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি ; পর্ব- ২
মো. সানোয়ার রশিদ



গতপর্বে আমি লিখেছিলাম কিভাবে বিশ্বায়ন বিশ্বব্যাপী বিপণন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছে যার মাশুল দিতে হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশের শ্রমসমাজকে। বিভিন্ন বিশ্লেষক তাদের গবেষণাপত্রে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়ানশীল দেশের শ্রমিক নিষ্পেষণকে তুলে ধরেছে, আর এজন্য দায়ী করেছে উন্নত দেশের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিস্বল্প মূল্যে পণ্য তৈরী করার চাপকে। এটা সহজে অনুমেয় যে, কমমূল্যে পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা পণ্যের খুচরা মূল্যকে কমিয়ে দেয়, যা সাধারণ ভোক্তাদের পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী করে তোলে। ফলশ্রুতিতে, ইউরোপ-আমেরিকার সাধারণ ভোক্তারা কম মূল্যে পণ্য কিনতে পারছে, যা পণ্য বিক্রিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর লাভবান হচ্ছে বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো। কিন্তু পণ্যের কম উৎপাদন মূল্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত করছে আমাদের মতো উন্নয়ানশীল দেশের শ্রমসমাজকে।

ফেয়ার ট্রেড বা ন্যায্য বাণিজ্য একটা বিপণন পদ্ধতি যা নিশ্চিত করে পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও ভোগের সাথে জড়িত সব পক্ষের স্বার্থ। এই ন্যায্য বাণিজ্য ব্যাবস্থার ধারণা নতুন কিছু নয়; কিন্তু, বিশ্বব্যাপী শ্রমসমাজের দলন-পীড়ন এই পদ্ধতির অনুসরণকে জোরালো করেছে। বিপণন ব্যাবস্থায় এই ধারণার প্রবর্তন অবশ্যই শ্রমিকের স্বার্থকে রক্ষা করে, কিন্তু একই সাথে বেড়ে যায় উৎপাদন খরচ। বিভিন্ন গবেষকের ধারণা অনুযায়ী ফেয়ার ট্রেড পদ্ধতি মেনে চললে উৎপাদন খরচ ১৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে সম্পূরক হারে বেড়ে যায় ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের খুচরা মূল্য।

অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বা ব্র্যান্ড যেমন পাতাগোনিয়া, পিপলস ট্রি ন্যায্য বাণিজ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আবার বেশ কিছু ব্র্যান্ড যেমন মার্ক্স্ এন্ড স্পেন্সর, মুনসুন, নিউলুক স্বল্প পরিসরে চালু করেছে ফেয়ার ট্রেড পদ্ধতির অধীনে পণ্য বিক্রি। উন্নত বিশ্বের কিছু এনজিও যেমন ক্লিন ক্লোথস ক্যাম্পেইন, লেবর বিহাইন্ড লেবেল, এবং এথিকাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাতলে দিচ্ছে বেশ কিছু নিয়ম-কানুন যা শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার্থে নির্দেশনা হিসাবে কাজ করে। বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছে। ফেয়ার ট্রেড পদ্ধতি অনুসরণকারী ব্রান্ডের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে যদিও অনেক বিশ্লেষক মনে করে এই বৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। বিভিন্ন মূলধারার ব্র্যান্ড যেমন এইচ এন্ড এম, যারা, দা গ্যাপ, প্রাইমার্ক, জর্জ, জেসি পেনি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এই ফেয়ার ট্রেড পদ্ধতিকে। উন্নত বিশ্বের সাধারণ ভোক্তারা শ্রমিকের ন্যায্যদাবি আদায়কারী ব্র্যান্ডগুলোকে পছন্দ করে, তারা একই সাথে পছন্দ করে সস্তায় পণ্য কেনাকাটা করা। কিন্তু, ফেয়ার ট্রেড যেহেতু হুত পণ্যের বাজারমূল্যকে বাড়িয়ে দেয়, মূল প্রশ্ন চলে আসে- সাধারণ ভোক্তারা পণ্যের কিছুটা বাড়তি মূল্য পরিশোধে কতটা আন্তরিক। কারণ শ্রমিককে তার ন্যায্য বেতন আর উন্নত কর্মপরিবেশ দিতে যে বাড়তি খরচ সেটাতো পূরণ করতে হবে তৈরী পণ্যের বাজারমূল্য কমিয়ে।

মোদ্দা কথা হলো - ন্যায্য বাণিজ্য ব্যাবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের কিছুটা বাড়তি মূল্য পরিশোধে শ্রমিক কতটা আগ্রহী?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যারোলিনা'র আরেকজন গবেষক তিন-ধাপে পাঁচ শতাধিক আমেরিকান ভোক্তা পর্যায়ের কনজুমারের উপর একটা গবেষণা কার্য চালাই। আমরা ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের দাম ভিত্তি মূল্য থেকে ১৫ শতাংশ, ৩০ শতাংশ, এবং ৪৫ শতাংশ বাড়িয়ে কনজ্যুমারদের পণ্য ক্রয়ের সম্ভাবনা জানতে চাই। তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখা যায় তারা ফেয়ার ট্রেড মেনে পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে আর এই উৎপাদন ব্যাবস্থায় জড়িত ব্র্যান্ড গুলোকে সমর্থন করে। কিন্তু পণ্যের মাত্র ১৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধিতেই তাদের ক্রয়-ইচ্ছা হ্রাস পায়।

কিছুটা বেশি মূল্যে পণ্য ক্রয়ের অনিচ্ছা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো কম মূল্যে পণ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা শ্রমিক নিষ্পেষণের দ্বার উন্মোচন করেছে। এমতবস্থায়, উন্নত বিশ্বের সাধারণ ভোক্তাদের বুঝতে হবে তাদের কম মূল্যে পোশাক কিনার ইচ্ছাই মূলত শ্রমিক নিষ্পেষণে দায়ী। সচেতন নাগরিক এবং বিভিন্ন শ্রম-অধিকার বিষয়ক ক্যাম্পেইন গ্রূপগুলো বিভিন্ন ব্রান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে জানান দিচ্ছে- শ্রমিকের অধিকার কে সম্মান দেখাতে হবে। একই সাথে তাদের উচিত হবে সাধারণ কনজুমারদের সচেতন করে তোলা। সাধারণ কনজুমারদের বুঝতে হবে তাদের অতিস্বল্প মূল্যে পণ্য ক্রয়ের আগ্রহ শ্রমিক নিষ্পেষণ কে উৎসাহিত করে।






Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution