sa.gif

শ্রমিক শিকলবন্দি: কতটা দায়ী পাশ্চত্য দৃষ্টিভঙ্গি ?
মো. সানোয়ার রশিদ



বিশ্বায়ন পৃখিবীব্যাপি ব্যবসা ও বিপণন ব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। যা সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থাকা প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক অনিয়মান্ত্রিক ভাবে বিস্তৃত করেছে বিশ্বব্যাপি।  এই পটপরিবর্তনে দুটো বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে যা কোন দেশকে দিয়েছে বাড়তি সুবিধা। আবার আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিয়েছে অসুবিধা। একটি হচ্ছে মূলধনের বিশ্বব্যাপি গতিশীলতা; গড়ে উঠেছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অথবা হুন্ডি যা মূলধনকে মুহুর্তের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। আরেকটি হচ্ছে স্থবির হয়ে থাকা শ্রম সম্পদ, যা স্থান, দেশ, কাল সময় খুবই সুনির্দিষ্ট এবং অপরিবর্তনশীল।

মূলধন এবং শ্রমিক দুটোই সম্পদ। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হচ্ছে অর্থনৈতিক মূলধন সমৃদ্ধ দেশগুলো ইউরোপ এবং আমেরিকাতে। আর শ্রমসম্পদ স্থবির হয়ে পড়ে আছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। বিশ্বায়নের  এই যুগে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের মূলধনের জোরে খেয়াল খুশি মতো পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের শ্রমিকদের ব্যবহার করে যোগান নিতে পারে পণ্যের চাহিদাও।  কিন্তু স্থবির শ্রমিক নিয়ে অপেক্ষায়  প্রহর গুনতে হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর। একটি উন্নয়নশীল  দেশকে লিপ্ত  হতে হয় আরেকটি উন্নয়নশীল দেশে সাথে বিদেশি ক্রেতা আকৃষ্ট করতে। আরো দুই দশক আগে মার্কিন কোম্পানিগুরো নাফটা (নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট) চুক্তির মাধ্যমে তাদের শ্রমঘন পণ্যের উৎপাদন সরিয়ে নিয়েছে শ্রমবহুল দেশ মে´িকোতে।  একই পথ অনুসরণ করেছে জাপানি কোম্পানিগুলো; সরিয়ে নিয়েছে পণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থা জাপান থেকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াই। মুলধন সমৃদ্ধ কর্পোরেট কোম্পনিগুলোর নিজ দেশের বাইরে গিয়ে পণ্য উৎপাদনকারি খোঁজার এই ধারা পরবর্তিতে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি একটি নির্দিষ্ট মহাদেশে। বরং ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। যেমন সময়সাময়িক সময়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ব্যবহার করতে এসেছে বিখ্যাত সুইডশ কোম্পানি এইচ এন্ড এম। এই ধারাকে পরিবর্ধন আর পরিনত করেছে উন্নয়শীল দেশগুরোর পণ্যের জোগানদাতা হওয়ার প্রবল ইচ্ছা। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর যেখানে কথা ছিল কর্পোরটে কোম্পানিগুলোর সাথে স্বদেশিয় সরবারহ কোম্পানিগুলোর ধরণ শ্রমবান্ধব দৃষ্টিকোন থেকে বাথলে দেওয়া। এবং তদানুযায়ী নজরদারি করা, সেখানে উণ্টো সরকারগুলোর তোষামোদি ভুমিকায় শ্রম অধিকারের সাধারণ আইনগুলো আকেজো হয়ে গিয়েছে। উদহারণ স্বরুপ বলা যায় ইন্দোনেশিয়ার কথা, যার সরকার বহুজাতিক কোম্পানি আকৃষ্ট করতে মজুরিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে রেখেছিলে। আর বাংলাদেশ এক পা এগিয়ে শ্রমব্যবস্থাকে নিয়ে গিয়েছে দাসসত্তে¡ও পর্যায়ে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর লোভ লালসা, আর আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর পণ্য উৎপাদনের ভাগিদার হওয়ার আকাক্সখা শ্রমিক নিষ্পেষনের দৃষ্টি উন্মোচন করেছে। ফলশ্রæতিতে মজুরি আজ অনেক কম। শ্রমিক সংগঠনগুলো নিষ্পেষিত এবং সার্বিক শ্রম ব্যবস্থা দাসত্বেও গন্ডি ছেড়ে বেরোতে পারেনি। উন্নত দেশের মানুষেরা কিভাবে দেখে আমাদের শ্রম নিপীড়ন তা জানতে জানা দরকার তাদের শ্রম সমাজের ধারাবাহিক উন্নয়ন। এখানে অনুমেয় যে, তাদের শ্রম সমাজের উন্নয়নের ধারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সাহায্য করে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা দেখে আমাদের আজকের শ্রমসমাজকে। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শ্রমসমাজের জন্য কতটা কল্যানকর অথবা ক্ষতির কারণ তা জানার জন্য আগে আলোচনা হওয়ার দরকার কি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর কিভাবে তারা গড়ে তুলেছে এই দৃষ্টিভঙ্গি।
শ্রমিক নিষ্পেষণ ইউরোপ আমেরিকার জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। তাদের আছে শ্রমিক দমনের আদি ইতিহাস। ইংল্যান্ডে প্রথম কারখানা শ্রমিকদের অধিকার পদদলিত করে লম্বা সময় কাজ করানো, আর নিন্ম মজুরি দেওয়া সম্পর্কে জানা যায় অষ্টাদশ শতাব্ধির শুরুর দিকে। আর আমেরিকায় প্রথম শ্রমিক নিষ্পেশনের  কথা জানায় যায়  অষ্টাদশ শতাদ্ধির  মাঝামাঝি সময়ে রড়আইল্যান্ড ও মাসাচুয়েসেট শহরের বস্ত্র শিল্পের কারখানায়। এই দীর্ঘ শ্রমিক নিষেপেষনের পথ মাড়িয়ে, আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা আজ প্রতিষ্ঠিত করেছে শ্রম অধিকার। যার ফলে পাশ্চত্য সমাজ ধারণা পেয়েছে যে, শ্রম সমাজের অধিকার রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হয় না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, নিষ্পেষনের যাঁতাকলে শ্রমিকদের শপে দিয়ে আনতে হয় একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি যা বাড়ায় শ্রমিকদের আয় আর ক্রয় ক্ষমতা এবং লাঘব করে শ্রমিকদের দুরবস্থা। পশ্চিমা ধারণা উপকরণ ভিত্তিক যা দুইটি পৃথক সময়ের মধ্যে সাঁকো হিসাবে কাজ করেছে। পৃথক সময় দুইটির প্রথমটি হচ্ছে শিল্পবিপ্লবের সময়কার শ্রমিক নিষ্পেষণ আর  দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাদের মোটামুটি রকম শ্রমবান্ধব বর্তমান সময়কাল।

সেই ১৮৪৫ সালের আমেরিকার মাসাচুয়েসট শহরের কথা। তখন সারা বগলী নামের এ বস্ত্র শিল্পে শ্রমিক তার অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন তাকে দৈনিক বারো ঘন্টা একটা দরজা বন্ধ ঘরে মানবেতর পরিবেশের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত এই মহিলা শ্রমিকের ঘাড়ে ছিল বাবার ঋণ শোধের দায়িত্ব। মার চিকিৎসার দায়িত্ব আর ছোট্ট ভাইকে মানুষ করার দায়িত্ব। যার ফলে কারো দরকার পড়েনি তাকে ধরে বেধে কাজ করানোর। বরঞ্চ সে স্বইচ্ছায় বেছে নিয়েছিল দাসত্বকে।
ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের কিছু আগেই শুরু হচ্ছিলো বস্ত্রশিল্পের ব্যাপক উৎপাদন। সপ্তদশ শতাব্ধীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বস্ত্র উৎপাদন নির্ভর করতো সুতা উৎপাদনের পরিমানের উপর। ১৭৩৩ সালে মাকুর (বুনন যন্ত্রের বিশেষ উপকরণ) গতি বাড়ার সাথে সাথে কাপড় উৎপাদনের হার বেড়ে যায় বহুগুনে। তখন বাড়তে থাকে সুতার চাহিদা। সুতার যান্ত্রিক উৎপাদন শুরু হয় ১৭৬৭ সালে পানির গতিশক্তিকে ব্যবহার করে।  তার কিছুটা পরে বাস্প বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিস্কারের মাধ্যমে শুরু হয় বস্ত্রশিল্পের অগ্রযাত্রা। সেই  সাথে শুরু হয় শ্রমিকের লম্ব সময় ধরে অমানবিক কর্মজীবন।  উন্নত বিম্বের সেদিনকার শ্রমিক আর আজকের তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিকের মধ্যে অনেক মিল।  বিভিন্ন জনের সেই সময়কালিন লেখা থেকে জানা যায়, কলকারখানায় শ্রমিকরা ১৬ ঘন্টা করে সপ্তাহে ৬দিন কাজ করতো। অনুপস্থিতির কারণে শ্রমিকদের মজুরি কাটা হতো চড়া দরে। সেই সাথে কাজের পরিবেশ ছিল ভয়ঙ্কর রকম অস্বাস্থকার।  এতিম ও দরিদ্র শিশুদের কারখানাগুলোতে অনেক কম বেতনে নিয়োগ দেওয়া হতো। তখন একটি দরিদ্র পরিবারের সবাই মিলে কাজ করেও হাপিয়ে উঠতো রোজগার খরচ জোগাতে। লন্ডন তখন দরিদ্র পরিবারগুলো গাদাগাদি করে জনবহুল, পয়নিস্কাশন বিহীন অস্বাস্থকার শ্রমিক কলোনীতে বাস করতো, তাদের ছিল না মিল কারখানাগুলোতে দাসত্ব করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প। বরঞ্চ কারখানায় কাজ করার জন্য শ্রমিকের সংখ্যা ১৭৫০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে ২৪ শতাংশ বেড়েছিল। তারপর ১৮৫০ সালের মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছিল ৪৫ শতাংশ। একই সময়ে কৃষিকাজে শ্রমিকের সংখ্যা ১৭৫০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে ৩৫ শতাংশ। এবং এরপর ১৮৫০ সারের মধ্যে কমে ২২ শতাংশ। লক্ষনীয় যে এই ধারা আজকের উন্নয়নশীল দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।  ক্রমবিকাশমান শিল্পকারখানা ইংল্যান্ডের সাধারণ মানুষের আয়কে দ্বিগুন করেছিল ১৭৫০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে। শ্রমিক ও দিনমজুরের জীবনমান বৃদ্ধি পেয়েছিলো ৬০ শতাংশ। ১৭৯০ সালের স্যামুয়েল স্লেটার ইংল্যান্ডে থেকে আমেরিকায় এসে প্রথম সুতা উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেন আমেরিবার ম্যাসচুসেটে। সর্বপ্রথম ১৮১৪ সালে পুর্ণাাঙ্গ বস্ত্রমিল স্থাপিত হয়। এরপর ইংল্যান্ডে ও ফ্রান্স থেকে আসে যন্ত্রপাতি। সুইডেন আর জার্মান থেকে আসে ক্যামিকেল। ইংল্যান্ডের বড় বড় ব্যবসায়ীরা আমেরিকার শিল্পকারখানায় করতে মূলধন বিনিয়োগ।

আমেরিকায় আসতে থাকা মুলধন আর কারিগরি জ্ঞান গড়ে তুললো দক্ষ শ্রমিক। ইংল্যান্ডে বহু পরে শুরু হয় আমেরিকার শিল্প বিপ্লব। কিন্তু এই বিপ্লব ঘটে খুব দ্রুত গতিতে। ১৮২০ সালে আমেরিকাতে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ইংল্যান্ডকে ধরে ফেলে ১৯০০ সালের শুরুর দিকে। উদহারণ স্বরুপ বলা যায় ১৯০৩ সালের ইংল্যান্ডের আমেরিকার শ্রমিকদের মাথা পিছু আয় সমান হয়। অথচ ১৮৪৫ সালে আমেরিকার শ্রমিকদের দশ ঘন্টা কাজ করার দাবিতে আন্দোলন করতে হয়েছে।। বস্ত্র শ্রমিকরা ১৮৪৫ সালে মাসাচুয়েসট রাজ্য সরকারের কাছে একটি পিটিশন দাখিল করে, যাতে শ্রমিকরা তাদের অব্যবস্থার কথা বর্ণনা করে এভাবে, “ শিল্প কারখানাগুলো শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর, জীবনের ঝুকি,পঙ্গুত্ব বরণ সাধারণ ঘটনা। তুলার হালকা ময়লা শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে মিশে ফুসফুসের অসুখ ঘটায়। শব্দদুষণ শ্রমিকদের বধির বানায়--।’ এরপরও স্রোতের মত মানুষ অভাবের তাড়নায় কাজে আসতে থাকে।  ১৮৩০ সালে আমেরিকার শ্রমিকরা মাসে ১২-১৪ ডলার উপার্জন করতো। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারখানাগুলো ৫ ডলারের মত কেটে নিতো রুমভাড়া হিসাবে।  শ্রমিকরা বাইরে থাকতে গেলে আরও বেশি খরচ হতো।  শ্রমিক নিষ্পেষনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতেই শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে।  উদহারণ স্বরুপ ১৮৩০ সালে আমেরিকার মাথা পিছু আয় ছিল ২০০০ ডলার, ১৮৫০ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০০০ ডলার। আর ১৯০০ সালে আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬০০ ডলার। মাথা পিছু আয় বাড়ার সাথে সাথে ভাল হতে থাকে কাজের পরিবেশ, বাড়তে থাকে শ্রমিকের ক্রয় ক্ষমতা। ১৯০০ সালের শুরু দিকে শ্রমিকরা ১০ ঘন্টা কাজের সুবিধা পায়।

ইংল্যান্ডে আমেরিকা ছাড়াও আজকে আরো উন্নত দেশ আছে। যেমন দক্ষিন কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর। আজ এই ৪টি দেশের মাথাপিছু আয় ইংল্যান্ড আমেরিকার সমান। যা ৫৫,০০০ ডলারের কিছুটা কম বা বেশি। ষাট বছর আগে হংকং আর সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ছিল ৩,৭০০ ডলার। আর তাইওয়ান ও দক্ষিন কোরিয়ার ছিল ১৫০০ ডলারের মতো। আর আমেরিকার মাথাপিছু আয় তখন ছিল ১৬০০০ ডলার। ১৯৫০ সালে শিল্পবিপ্লব ঘটেনি এশিয়ার এই চারটি দেশে। ১৯৫৫ সালে এই চারটি দেশে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। সাথে ঘটতে থাকে শ্রমিক নিষ্পেষন। কিন্তু মাত্র ৫০ বছরে হয়ে উঠে উন্নত জাতি। শ্রমিক নিষ্পেষন হয়ে যায় ইতিহাস।






Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution