sa.gif

রানা প্লাজা শ্রমিক হত্যাকান্ডের ৪ বছর: শ্রমিকদের কান্না অাজও থামেনি
এম এ শাহীন


২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালে সাভার রানা প্লাজা ভবন ধ্বসের নীচে চাপা পড়ে আহত-নিহত হয় অসংখ্য শ্রমিক। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শ্রমিক হত্যাকান্ডের ঘটনা এটি । সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ১,১৩৮ জন। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ৩০১ জন, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছে অসংখ্য শ্রমিক।
 মর্মান্তিক এই শ্রমিক হত্যাকান্ডের ঘটনা আজও  ভুলতে পারেনি স্বজন হারা পরিবার ও এদেশের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর মানুষের চোখের জল এখনও ঝরছে। অঙ্গ হারানো শ্রমিক তার পরিবারে বুঝা হয়ে নিদারুন কাষ্টে দিনাতিপাত করছে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে আসা অসহায় দারিদ্র মানুষ গুলোকে সেদিন ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। কারখানার মালিকরা যেনে  শুনে শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তাদের হত্যা করে। মালিকদের মুনাফালোভী লালসার কবলে শ্রমিকদের সব স্বপ্ন ভবন ধ্বসের চাপায় পড়ে শেষ হয়ে যায়।

রানা প্লাজা ধ্বসের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে আমাদের দেশের মালিকরা রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার পরও কিভাবে শ্রমিকদের সীমাহীন অবহেলা করে। তাদেরকে নিরাপত্তাহীনতার মাঝে কাজ করতে বাধ্য করে তা উন্মোচিত হয়েছে । এই ঘটনার ৪ বছর অতিবাহিত হলো এখনও পর্যন্ত হত্যাকারীদের বিচার হয়নি উল্টো গ্রেফতারকৃত মালিকসহ দায়ীদের জামিনে মুুক্তি দেয়া হয়েছে।
 নিহত-আহত শ্রমিকদের সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ১২৭ কোটি কাটা জমা হয়েছিল। যেখান থেকে  শ্রমিকদের সহায়তা দেয়া হয়েছে।  এখনও অনেক পরিবার ক্ষতিপূরণ পাইনি অথবা যা পেয়েছে তা নামমাত্র অর্থ দেওয়া হয়েছে।  আইএলও কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক মান অনুসারে তাদের  ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি । আহতদের অনেকের চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়নি, যারা পঙ্গু হয়েছে তাদের পূর্ণবাসন করা হয়নি। চিকিৎসার অভাবে  শ্রমিকরা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে, অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে।
 বিজিএমইএ এ ব্যাপারে চরম অবহেলার পরিচয় দিচ্ছে। তারা শুধু দায়ী মালিকদের বাঁচাতে তৎপর রয়েছে। মুনাফাখোর মালিকরা সরকার এবং বিজিএমইএ এর আশ্রয় প্রশ্রয়  পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।  শ্রমিকদের তারা মানুষ হিসেবে গণ্যই করে না। মালিকদের এই আচরণ শিল্পকে চরম বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রানা প্লাজা ও তাজরিনের হত্যাকাণ্ডই নয়, গত কয়েক বছর ধরে এমন অসংখ্য ঘটনায় শত শত শ্রমিক অকালে প্রাণ হারিয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনা বা হত্যাকান্ড সংগঠিত হওয়ার পরই তদন্ত কমিটি গঠিত  হয়।

 আলোচনা সমালোচনা নিয়ে কিছুদিন দেশজুড়ে তোলপাড়ও হয়। কিন্তু এত বড় বড় হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয় না। অথচ প্রতিটি ক্ষেত্রেই মালিকদের অবহেলার জন্যই এসব দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। সুতরাং শ্রমিকরা তাদের জীবন রক্ষার স্বার্থেই হত্যাকরীদের সর্বোচ্ছ শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করাতে হবে।

খুবই দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি মজবুত হয়েছে। আজ তাদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই, অকালে জীবন দিতে হচ্ছে তাদের। পোশাক শ্রমিকদের প্রতিটি মুহুর্ত যেন নিরাপত্তাহীনতা- শোষণ-বঞ্চনা-অসহাত্ব আর মৃত্যুর মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে।  অন্যদিকে শ্রমিক হত্যার দায়ে অভিযুক্ত খুনি মালিক বিভিন্ন মহলের আশ্রয় প্রশ্রয় পেয়ে চলেছে। শ্রমিক হত্যার দায়ে অভিযুক্ত কারখানার মালিক সোহেল রানাসহ দোষীদের আদৌ যথার্থ শাস্তি হবে কি না তা নিয়ে আশংকা দেখা দিয়েছে। দেশবাসী ও সারাদুনিয়ার মানুষ রানা প্লাজার সকল মালিক ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চায়।  এসব রোধ করতে হলে  শ্রমিক হত্যাকারী  অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে আর কোন মালিক শ্রমিক হত্যার ষড়যন্ত্র করার সাহস না পায়।

রানা প্লাজা ও তাজরিন ফ্যাশনের শ্রমিক হত্যাকান্ডের ৪ বছর অতিবাহিত হয়েছে। স্বজন হারা পরিবার ও শ্রমিকদের চাওয়া বিচারের বাণী আজ নিভৃতে কাঁদে। সুতরাং একমাত্র শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তিই পারবে হত্যাকারীদের উপযুক্ত বিচারের কাফগড়ায় দাঁড় করাতে।  নিহত-আহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন, জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণ তথা ন্যূনতম মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকা ও শ্রমিকদের অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এদেশে সস্তা শ্রমনির্ভর উন্নয়ন নীতির মাধ্যমে শ্রমিকদের শুধু নিপীড়নই করা হচ্ছে না, কখনো কখনো মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

 এই সময় কালে ৩০ বছর পূর্বে প্রণীত ক্ষতিপূরণ আইন বর্তমানে খুবই অসামঞ্জস্য পূর্ণ ও অপ্রতুল। সুতারাং ক্ষতিপূরণ আইনের পরিবর্তন করে যুগোপযোগী করা অতিব জরুরী। সকল শ্রমিক হত্যার বিচার করা, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা ও সকল শ্রমিক বিশেষকরে নারী শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।  প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে-আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে বিনামূল্যে  শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সুচিকিৎসা প্রদান কর‍া প্রিয়োজন। দেশের সকল মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অর্থাৎ  কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারেনা। সুতরাং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনায় নিহত-আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের যথার্থ অর্থের পরিমাণ নির্দিষ্ট করতে হবে। ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সঠিক ভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করে কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে-সে বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট ভাবে নির্ণয় করা এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রাপ্তির জন্য শ্রম আইনের বিধান সংশোধন করতে হবে।

লেখকঃ সভাপতি-নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।






Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution