sa.gif

চাই শ্রমবান্ধব আইন ও শ্রমিকদের ঐক্য
ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান


অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও প্রতিবছর মে দিবস ঘটা করে পালন করা হয়। শ্রমিক-কর্মচারীরা লাল পতাকা উঁচিয়ে নেচে-গেয়ে বিজয় উৎসবের মতো করে দিনটি পালন করে। দিনটি ঐতিহাসিকভাবে শ্রমিকদের বিজয়ের দিন, আনন্দের সংহতির দিন, উৎসবের দিন, অনুপ্রেরণার দিন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কি বাংলাদেশের শ্রমিকরা বিজয়ীর বেশে দিনটি উদ্যাপন করতে পারে? পারে না। তবু আবেগতাড়িত হয়ে আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ দিনটিতে আনন্দ-উৎসব করে। স্বাধীনতার পর দ্রুততম সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিনটিকে ছুটি ঘোষণা করেন এবং আজও তা সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়। স্বাধীনতার জন্য সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ধারাবাহিক সংগ্রাম এবং ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার শ্রমিক-কৃষকসহ মেহনতি মানুষের শোষণ মুক্তির মাধ্যমে একটি মর্যাদাসম্পন্ন ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গণতান্ত্রিক সংগ্রামগুলোয় সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষ এক বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নেও শ্রমিক শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কিন্তু দেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং তারা নানাবিধ সামাজিক বৈষম্য ও অনাচারের শিকার। আমাদের দেশের শ্রমিকরা ১৯৬৯ সালে শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশের মাধ্যমে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ যে সুযোগ-সুবিধার জন্য আন্দোলন করেছে, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এখনো শ্রমিকরা সে অধিকার থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়া ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকেও তারা অনেকটা বঞ্চিত। নিরাপদ কর্মস্থান, শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আমাদের দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় প্রায় এক হাজার ৪৪৪ মার্কিন ডলার। কিন্তু দেশে ক্রমেই ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অভিবাসী শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করেও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে। আমাদের দেশের অসংগঠিত শ্রমিক যেমন—গার্মেন্ট, নির্মাণ, প্রাইভেট হেলথ সেক্টর, চাতাল, বিড়ি, দিনমজুর, উন্নয়নকর্মী, স্বনিয়োজিত শ্রমিক, কুটিরশিল্প, শিল্প, গ্রামগঞ্জে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ওয়ার্কশপ কারখানা, মত্স্যজীবী ও কৃষি শ্রমিকরা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এই শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের নেই কোনো নিয়োগপত্র, নেই শ্রমঘণ্টা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বা নেই কোনো সামাজিক সুরক্ষা। তারা বাঁচার মতো মজুরি ও আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ মোতাবেক অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত। আশির দশকে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে গার্মেন্টশিল্পের সূচনা হয়। আজ এই শিল্প বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। তাদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ওভারটাইম, নিয়োগপত্র, কর্মস্থলের নিরাপত্তা—কোনো কিছুই আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শ্রমিক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ২০১৩ সালে পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা গার্মেন্ট সেক্টরের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হলেও তা কোনোভাবেই শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বহু কারখানায় এই ন্যূনতম মজুরি এখনো কার্যকর হয়নি।

জনজীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংস্থান ও সেবামূলক কার্যাবলি বৃদ্ধি করার জন্য সুষম অর্থনৈতিক উন্নতি বিধান করাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মসূচির উদ্দেশ্য। কেননা দেশের প্রত্যেক নাগরিক যখন সুফল ভোগ করে তখনই সার্বিক উন্নতি অর্থবহ হয়। বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান শ্রমজীবী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই সংবিধান শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় অনেক নির্দেশনা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে তাগিদ দিয়েছে। যেমন—কৃষক ও শ্রমিকের যথাযথ মজুরি, নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণ, যোগ্যতানুসারে কর্মের সুযোগ সৃষ্টি, ধর্মীয় বৈষম্য বিলোপ, সরকারি নিয়োগে সুযোগের সমতা, জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরণ, সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তাবিবেক ও বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

আইএলওর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইএলও সনদ, আন্তর্জাতিক শ্রমমানগুলো ও ঘোষণাগুলোর প্রতি সম্মান দেখাতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এর অন্যতম হলো ঐতিহাসিক ফিলাডেলফিয়া ঘোষণা—সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পৃথিবীর যেকোনো স্থানের দরিদ্র সবার জন্য হুমকি পরিহার এবং সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা সবার অধিকার।’ স্বাধীনতা পূর্বকালে দেশে কোনো কল্যাণমুখী শ্রমনীতি ছিল না। বিভিন্ন সময় প্রণীত বিধিবিধানের ভিত্তিতে এ দেশের শ্রমবলয় শাসিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর জাতির জনকের নির্দেশক্রমে ১৯৭২ সালে দেশে প্রথম শ্রমনীতি প্রণীত হয়। সেই শ্রমনীতিতে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ সুরক্ষা ও কল্যাণের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সেখানে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক উন্নয়ন, শিল্পে শান্তি ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন ও জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার দাবিতে এ দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সরকার যে শ্রম আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করেছে, তাতে শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালায় শ্রমিকদের স্বার্থ না দেখে মালিকদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ২০১৫ সালে প্রণীত শ্রম বিধিমালা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা এবং আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮-এর পরিপন্থী। শ্রম বিধিমালায় শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে। যেমন Participatory Committee নামে একটি ধারা সৃষ্টি করে Participatory Committee-কে ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গার্মেন্ট সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন বন্ধ এবং সীমিত করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে ক্ষুদ্র শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যে শ্রম খাত গড়ে উঠেছে, তাদের ন্যায্য মজুরি এবং মজুরিবৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়নি। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদসহ এ দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ব্যক্তিমালিকানা-নির্বিশেষে সব শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাঁচার মতো মজুরি নির্ধারণপূর্বক একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি প্রথা চালু রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণাসহ একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

আমরা লক্ষ করছি, শ্রম আইন সংশোধনী ও শ্রম বিধিমালা প্রণয়নে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সরকারের আলোচনা ও সুপারিশ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইএলও আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার, দ্বিপক্ষীয়-ত্রিপক্ষীয় আলোচনা ও চুক্তি, ২০১২ সালে ত্রিপক্ষীয় কমিটিতেও সরকারের সুপারিশ, শ্রম বিধিমালা চূড়ান্তকরণ বিষয়ে স্কপ ও শ্রমিক পক্ষের সুপারিশগুলো সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সম্মতি কোনো কিছুরই প্রতিফলন ঘটেনি। পাশাপাশি শ্রম বিধিমালায় শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও পছন্দমতো নেতা নির্বাচনের অধিকার খর্ব করা, শ্রমিক নিয়োগ ঠিকাদার সংস্থা চালু, স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ, শ্রমিকের সংজ্ঞায় প্রকৃত শ্রমিককে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়াসহ আরো কিছু বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং আইএলও কনভেনশনের নির্দেশনা ও সুপারিশও লঙ্ঘিত হয়েছে। তাই আবার সব পক্ষের মিলিত উদ্যোগে একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি। শ্রম আইন করলেই শুধু হবে না, এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, তবেই শিল্প সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে। দেশ শিল্পায়িত হবে। শ্রমিকরা তার অধিকার ফিরে পাবে।

বিশ্বায়ন, বিরাষ্ট্রীকরণ, উদারীকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রম ও শিল্প নীতি প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুটপাট করে একদল মুনাফালোভী লুটেরা ধনিকের আবির্ভাব, মালিক ও সরকারের নেতিবাচক অবস্থান, সুবিধাবাদী শ্রমিক নেতৃত্ব, অসংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, দলীয়করণ ও অতিমাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ ইত্যাদি কারণে শ্রমিক আন্দোলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হচ্ছে দেশি-বিদেশি করপোরেট পুঁজির আগ্রাসন। সর্বশেষে করপোরেট পুঁজির অনুপ্রবেশ শ্রমিকদের সংগ্রামী চেতনা ও ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের তত্পরতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

লুটেরা মালিক গোষ্ঠীর ট্রেড ইউনিয়নবিরোধী মনোভাব আমাদের সবারই জানা রয়েছে। তারা কোনোভাবেই ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম সহ্য করতে পারে না। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করলেই নেতাদের চাকরিচ্যুতিসহ মামলা-হামলা দিয়ে দমনের অপচেষ্টা করা হয়।

এ অবস্থায় শ্রমিকদের একটি ছাতার নিচে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়নের প্রতি লুটেরা মালিকদের আক্রমণ প্রতিহত করা যাবে না। তাই আজ শ্রমিকদের তার ন্যায্য অধিকার ও দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শ্রমিক ঐক্য যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।

আজকের এই মে দিবসে সরকারের কাছে জোর দাবি, শিল্প ও শ্রমিকদের স্বার্থে দ্রুত গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও শ্রমবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করুন। শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কারণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন-সংগ্রামই দাবি আদায়ের একমাত্র পথ।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

( মে দিবস উপলক্ষে লেখাটি লেখা)






Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution