sa.gif

রানা প্লাজা ধস
মালিকের সর্বোচ্চ শ্রমিক শোষণ ও অবহেলার পরিনতি


সৌমিত্র কুমার দাশ

রানাপ্লাজা নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে আসে সেই দিনের স্মৃতি। সেই ২৪ এপ্রিলের ভয়াবহ স্মৃতি। সেইদিন সকাল সাড়ে ৮ টার সময় রানাপ্লাজার সামনেই আমাদের অফিসে আরও কিছু শ্রমিক সংগঠনের সাথে এক পূর্ব নির্ধারিত সভা হাওয়ার কথা ছিলো। ঢাকায় এক নারী শ্রমিক সমাবেশের ব্যাপারে। সভার জন্য নেতৃবৃন্দ সবেমাত্র সবাই এসে উপস্থিত হচ্ছিলেন। তার ১০/১৫ মিনিটের মধ্যেই ইতিহাসের ভয়াবহতম এই দূর্ঘটনা সংঘটিত হয়। ঘটনার ২/৩ মিনিটের মধ্যেই আমরা রানাপ্লাজার সামনে গিয়ে উপস্থিত হই। তখনও আমি বুঝতে পারিনি কি ভয়াবহ পরিনতি অপেক্ষা করছিল আমাদের। এই হতভাগ্য শ্রমিকদের জন্য। চারদিকে শুধু হাহাকার আর মৃত্যুর  মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাজারো শ্রমিকের বাঁচার আর্তনাদ।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ৪০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিকসহ শ্রমজীবী মানুষের জন্য এক ভয়াবহ শোক ও বেদনার দিন। সাভারে রানাপ্লাজা ভবন ধসে ১১৩৭ জন শ্রমিক মৃত্যুবরন করেন। ২৫০০ শ্রমিক আহত হয়, ৩০০ শ্রমিক নিখোঁজ হয়ে যায়। মালিকের অবহেলায় গার্মেন্টস শিল্পে সারা দুনিয়ায় এত বড় হত্যাযজ্ঞ আর হয়নি। সেদিন মৃত শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারীতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো। ভালবাসায় সারা দেশের মানুষ শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো। ছাত্র  শ্রমিক সাধারন জনগণ দিনরাত পরিশ্রম করে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়াছে।  উদ্ধার কাজ করতে গিয়ে জানা গেছে মালিকদের নির্মমতার চিত্র। সন্তান সম্ভাবা মা ধ্বংসস্তুপের  মধ্যে সন্তান প্রসব করেছে। রক্তে ধূলায় মাখা-মাখি হয়ে শিশু জন্মের সাথে সাথেই জানলো মালিকের শোষণ কাকে বলে। মালিকের কি সীমাহীন অবহেলা হতে পাওে গার্মেন্টস শ্রমিকদের। তার শ্রমিক মা কীভাবে পেটের দায়ে কাজ করতে এসে জীবন হারায়। জীবন বাঁচাতে পা কেটে, হাত কেটে উদ্ধার করতে হয়েছে অসংখ্য শ্রমিককে।
সারা জীবন পঙ্গত্বের যন্ত্রণা, ভবনে চাপা পড়ে থাকার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে এসব শ্রমিক। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গিয়ে মালিকের মুনাফার পাহাড় গড়তে আগুনে পুড়ে ভবনের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করছে শতশত শ্রমিক। আর কত শ্রমিক যে দুর্বিসহ জীবন-যাপন করছে তার হিসেব নেই।

"মালিকের শোষণ আর সরকারের অবহেলা দুর্ঘটনায় এত শ্রমিকের মত্যুও কারণ"
ওানাপ্লাজায় প্রথম নয়, এর আগে আরও ২১৭টি ছোট বড় ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২৫০০ এরও বেশী গার্মেন্টস শ্রমিক। কিন্তু কোন মালিক ক্ষতিপূরণ দেয়নি, শাস্তি পায়নি কোন মালিক। মালিককে রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও সরকার। সরকার অনুদান দিয়েছে কিন্তু মালিকের কাছ থেকে শ্রমিকের প্রাপ্য আদায় করে দেয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন ৩০০ কোটি টাকা হলে অগ্নিকান্ড বা ভবন ধসের পর শ্রমিকদের উদ্ধার করার যন্ত্রপাতি কেনা যেতো। ২০১৫ সালে গার্মেন্টস রপ্তানি করেছ ২৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লক্ষ ১৬ হাজার কোটি টাকা) অথচ তাদের জন্য ৩০০ কোটি বরাদ্ধ করেনি সরকার। কেন পাঁচতলা ভিত্তি আর ডোবার উপর রানাপ্লাজা নির্মিত হল এবং কীভাবে তা ৯ তলা হলো? এসবের জন্য দায়ি কারা? তাদের কী শাস্তি হলো? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। বাংলাদেশের শ্রমিকদের শ্রম যেমন সস্তা, জীবন তেমনি মূল্যহীন এই সব  মালিক ও রাষ্ট্রের কাছে।

"শ্রমিকের প্রতি করুণা নয় যথাযথ নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরন চাই"
কর্মস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না করলে বাংলাদেশের আইনে শাস্তির বিধান খুবই দুর্বল। ক্ষতিপূরণ খুবই সামান্য। তাজরীন অগ্নিকান্ড এবং রানাপ্লাজা ধসের পর দেখা গেল মালিকরা কোনো ক্ষতিপূরণ না দিয়েই রেহাই পেয়ে যায়। সরকারি ত্রাণ তহবিল, আন্তর্জাতিক ক্রেতা, বিজিএমই,বিকেএমইএ,
ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন প্রভৃতির সাহায্য নিয়ে শ্রমিকদের সহায়তা দেয়া হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট মালিকের অবহেলায় কর্মস্থলে নিহত হলে ক্ষতিপূরণ কি হওয়া উচিৎ তার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে ক্ষতিপূরণেল হার নিরুপণ কমিটির কাছে দিয়েছিল। সে প্রস্তানায় ভধঃধষ ধপপরফবহঃ ধপঃ-১৮৫৫ এর আলোকে ষড়ংঃ ড়ভ বধৎহরহম অনুযায়ী আজীবন আয়ের পরিমান হিসাব করে ক্ষতিপূরণের হিসাব উল্লেখ করা হয়েছিল সাভার রানাপ্লাজা ধসে মৃত শ্রমিকদের গড় বয়স ২৫ বছর। শ্রমিকদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬০ বছর। তাহলে আরো ৩৫ বছর চাকরি করতে পারতো। সেই অনুযায়ী হিসাব করলে ১ জন মৃত শ্রমিকের পরিবারকে কমপক্ষে ৪৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আমি মনে করি টাকা দিয়ে জীবনের মূল্য নির্ধারন করা যায় না। তবুও মৃত শ্রমিক পরিবারে ক্ষতিপূরণ হিসাবে এ পরিমাণ টাকা পেলে অন্ত টিকে থাকার অবলম্বন পাবে। কিন্তু এ প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয় নাই। ফলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সৌমিত্র কুমার দাশ
সভাপতি, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট আশুলিয়া-সাভার-ধামরাই আঞ্চলিক কমিটি।

লেখাটি সংগ্রহ ও অনুলিখন করেছেন: মো.এসজে বাবু।






Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution