sa.gif

স্বাধীনতার জন্য ক্ষুদিরামের জীবন দানের দিন আজ
:: 09:30 :: Tuesday August 11, 2020 Views : 77 Times

তখন দেশ শাসন করতো ইংরেজরা। সেই ইংরেজদের এ দেশ থেকে বিড়াতি করার জন্য প্রথম যে জীবন দিয়েছিল তিনি সেই ক্ষদিরাম। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ক্ষদিরামকে ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে ইংরেজরা। স্বাধীনতার জন্য প্রথম জীবন উৎসর্গ কারী ক্ষদিরামকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।    


ক্ষুদিরাম আমাদের মত আট দশটা ডানপিটে, বাউন্ডুলে ছেলের মতই বেড়ে উঠছিল, তখনই তাঁর মনে লাগে বিপ্লবের ছোঁয়া। অল্প বয়সেই বিপ্লবী মতাদর্শে নিজেকে আস্তে আস্তে তৈরি করতে থাকেন। বিপ্লবী কর্মকান্ডের সূতিকাগার হয়েছিল সেই মেদিনীপুরেই। ১৯০২ এবং ১৯০৩ সালের দিকে যথাক্রমে শ্রী অরবিন্দ এবং সিসটার নিবেদিতা জনসম্মুখে বিপ্লবী ভাষণ রাখলে ছোট্ট ক্ষুদিরাম বিপ্লবী হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পান।

আবার ঠিক সেই সময়েই মেদিনীপুরে একটা “অনুশীলন সমিতি” নামে গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে ওঠে হেমচন্দ্র দাস কানুনগোর নেতৃত্বে। তাঁর সহকারী ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ক্ষুদিরাম কলেজিয়েট স্কুলে এক বন্ধুর সুবাদে সত্যেন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় ঘটে। কিশোর ক্ষুদিরাম সেই সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর বৈপ্লবিক জীবনের সূচনা ঘটান। সাথে সাথে সংগঠনে থাকাকালীন নিজেকে শরীরচর্চার পাশাপাশি রাজনৈতিক শিক্ষা পেতে শুরু করেন। পিস্তল চালনাতেও পারদর্শী হয়ে উঠেন। এবং আস্তে আস্তে তাঁর নেটওয়ার্ক বাড়তে থাকে। পরিচয় ঘটে কলকাতার বারিন্দ্রকুমার ঘোষের সাথে।

বৈপ্লবিক কাজে ক্ষুদিরাম :
সাল ১৯০৫। একদিকে বঙ্গভঙ্গ আরেকদিকে স্বদেশী আন্দোলন। উত্তাল বাংলা। ১৫ বছর বয়সী ক্ষুদিরাম বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে উৎপাদিত কাপড় পোড়ানো এবং ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত লবণ বোঝাই নৌকা ডোবানোর কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি তাঁর বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের সূচনা করেন।

কিছু সময়ের মধ্যেই সবার চোখ কাড়েন ক্ষুদিরাম। একের পর এক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে থাকেন। ১৯০৬ সালে মেদিনীপুরের মারাঠা কেল্লায় এক শিল্প প্রদর্শনী হয়। সেখানে তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আদেশে তৎকালীন রাজদ্রোহমূলক পত্রিকা “সোনার বাংলা” বিলি করেন। আর এই অপরাধে প্রথমবারের মত গ্রেফতার হন এই বিপ্লবী কিশোরটি। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় তাঁর বয়স কম বলে।

সক্রিয় কর্মী ক্ষুদিরাম:
কিন্তু ক্ষুদিরাম থেমে যাননি। একের পর এক বিদ্রোহ চালিয়ে গিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বিরুদ্ধে। বিপ্লবী দলের অর্থায়নের জন্য তিনি ১৯০৭ সালে হাটগাছা গ্রামের এক ডাক-হরকরার মেইল ব্যাগ চুরি করেন। একই বছরে নারায়ণগড়ের রেল স্টেশনের কাছে ছোটলাটের গাড়িতে বোমা আক্রমণ করেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের মধ্যপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধেও আর প্রতিবাদের স্বর ছিল অনেক উঁচু। এমনকি তিনি পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতেও রাখেন তিনি।

এভাবেই ১৬/১৭ বছর বয়সেই তিনি হয়ে উঠেন সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী।

কিংসফোর্ড এবং ক্ষুদিরাম:
দিন দিন আন্দোলন প্রবলতর হচ্ছিল। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল ইংরেজদের অত্যাচার। বিপ্লবীদের আন্দোলন চিরদিনের জন্য বানচাল করে দিতে চলছিল নীলনকশা। রাজদ্রোহ মামলায় বিপ্লবীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য কুখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড।

অপরদিকে ১৯০৭ সালে বারিন্দ্রকুমার দাস হেমচন্দ্র কানুনগোকে প্যারিস পাঠান বোমা বানানোর কৌশল শিখতে। রাশিয়ান বিপ্লবী নিকোলাস সাফ্রান্সকি ছিলেন তাঁর শিক্ষক। দেশে এসে তিনি বোমা বানানোর কাজ শুরু করলেন। দল সিদ্ধান্ত নিল যে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার। কারণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একটা ঝটকা দেওয়ার জন্য কুখ্যাত কিংসফোর্ডকে হত্যা করাটাই শ্রেয় ভেবেছিলেন তাঁরা। তাকে হত্যা করার প্রথম চেষ্টাটা ছিল একটি বই বোমার মাধ্যমে।

হেমচন্দ্রের তৈরি ঐ বোমাটা ছিল বইয়ের মধ্যে; আর এমনভাবে বানানো ছিল যাতে বইটি খুললেই বিস্ফোরণ ঘটে। একটি খালি ক্যাডবেরি কোকোয়ার টিনের বক্সের মাঝে পিকরিক এসিড এবং তিনটি ডিটেনেটোর দিয়ে বানানো হয়েছিল বোমাটি। পরেশ মল্লিক নামে এক বিপ্লবী তার বাড়িতে বোমাসমেত বইটি পাঠিয়ে দেয়। তবে কিংসফোর্ড তার পুরোনো বই ভেবে বইটি আর খুলে না দেখলে সেইবারে মিশন ব্যর্থ হয়ে যায়। এবং ইংরেজ সরকার কিংসফোর্ডের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁকে মুজাফফরপুরে বদল করে দেয়।

কিন্তু বিপ্লবী দল এতে দমে যায়নি। আবার তাঁরা পরিকল্পনা করে হত্যা করার। এবার দায়িত্ব পড়ে ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর উপর।

প্রফুল্ল চাকী

ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকী। কেউ চিনত না একে অপরকে। তবে দুইজনের আদর্শ ছিল এক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তাঁরা পিছপা হতেন না। তাদের এক বৈপ্লবিক আদর্শ তাঁদের কিংসফোর্ড হত্যা মিশনে এক করে। রেল গাড়িতে ক্ষুদিরামের সাক্ষাত হয় চাঁদপুরের প্রফুল্ল চাকীর সাথে। তাঁদের গন্তব্য ছিল মুজাফফরপুর।

মুজাফফরপুর এবং কিংসফোর্ড হত্যা মিশন :
কিংসফোর্ডের বাংলোর পাশের একটি ধর্মশালায় উঠেন প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম। তাঁরা টানা ৭ দিন ধরে সকাল বিকাল সন্ধ্যা সবসবময় কিংসফোর্ডের গতিবিধি লক্ষ করতে লাগলেন। কিংসফোর্ডের নিত্যদিনের কাজের মধ্যে কেবল অফিসে আর ক্লাবে যাওয়াই ছিল মূল। বাড়ির পাশেই ছিল ইউরোপিয়ান ক্লাব। খেলা শেষ করেই তিনি বাসায় যেতেন।

৩০ শে এপ্রিল, ১৯০৮। কিংসফোর্ড ইউরোপিয়ান ক্লাব থেকে খেলা শেষ করে ফিরছিলেন নিজ গাড়ি করে। সেদিন তার সাথে এডভোকেট কেনেডির স্ত্রী ও তার মেয়ে। কিংসফোর্ড ছিলেন নিজ গাড়িতে। কেনেডির স্ত্রী ও তার মেয়ে ছিলেন অন্য গাড়িতে। তবে দুটো গাড়িতে দেখতে প্রায় একই রকম।

অদূরে দাঁড়িয়ে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলেন প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম। তাঁদের হাতে হেমচন্দ্রের বানানো বোমা।

যখনই ঘোড়ার গাড়ি দুইটি ইস্টার্ন গেটের কাছাকাছি পৌঁছে, রাত ৮ কিংবা সাড়ে ৮টা নাগাদ প্রফুল্ল এবং ক্ষুদিরাম এসে ঘোড়ার গাড়িকে লক্ষ করে বোমা ছুঁড়ে। বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরিত হলেও কিংসফোর্ড তার গাড়িতে অক্ষত অবস্থাতেই রয়ে যান। প্রফুল্ল এবং ক্ষুদিরাম আসলে বোমা ছুঁড়ে মেরেছিলেন মিসেস কেনেডি এবং তার মেয়েকে বহনকারি গাড়িতে। এতে তাঁদের মৃত্যু হয়।

ব্যর্থ মিশন এবং আটক ক্ষুদিরাম :
যখন বোমা ছুঁড়ে মারা হয়েছিল তখন ছিল সন্ধ্যার সময়। এই সময় চারপাশেই এলাকা পুরো সরবই ছিল। তাই বোমা হামলার পর পরই রেলস্টেশন ,রাস্তাঘাট সব জায়গায় কড়া নজরদারি লেগে যায়। এমনকি তাঁদের ধরিয়ে দেওওার জন্য ১০০০ রুপি পুরস্কার ও ঘোষণা করা হয়। আর এই কড়া নজরদারিকেই ফাঁকি দিয়ে প্রফুল্ল চাকী এবং ক্ষুদিরাম দুইজন দুইদিকে পালাতে শুরু করে। প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তিনি গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

অন্যদিকে ক্ষুদিরাম ঘটনার পরই হাঁটতে শুরু করেন। পালানোর জন্য। তিনি সারা রাত একটানা হেঁটে হেঁটে প্রায় ২৫মাইল দূরত্ব অতিক্রম করেন। পরের দিন, অর্থাৎ ১মে সকালবেলা ক্লান্ত ক্ষুদিরাম ওয়ানি রেলস্টেশনের কাছে এক চায়ের দোকান থেকে পানি চাইলে পুলিশের নজরে পড়েন। আর তখনই গ্রেফতার হন তিনি। তাঁকে দেখতে সেদিন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল সেখানে। নির্ভীক এই বিপ্লবীর কণ্ঠে তখনও ধ্বনিত হয়েছিল বন্দে মাতরম কথাটি।

আটকের পর ক্ষুদিরাম

কাঠগড়ায় ক্ষুদিরাম :
ক্ষুদিরামকে বারবার পুরো মিশন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলেও সে নিজের নাম ছাড়া আর কারো নাম বলে নি । এমনকি সব দায়ভার ও নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।

২১ মে, ১৯০৮ এ তার বিচারকার্য শুরু হয়। জাজ হিসেবে ছিলেন মিস্টার কর্নডফ এবং জুরি হিসেবে ছিলেন জানকিপ্রসাদ ও নাথুনি প্রসাদ। ক্ষুদিরামকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও ক্ষুদিরাম হাসছিলেন বলে জাজ কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবলেন, হয়তো বয়স কম বলে ক্ষুদিরাম ফাঁসির ব্যাপারটা বুঝতে পারছেনা। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ফাঁসিতে ঝুলে মরতে হবে সেটিকে সে বুঝতে পারছে কিনা। উত্তরে মুচকি হেসে বলেন তিনি তা জানেন। ক্ষুদিরামকে তার শেষ ইচ্ছা কি জানতে চাইলে বলেন, তাঁকে কিছুটা সময় দেওয়া হোক, যাতে তিনি জাজকে বোমা বানানো শিখাবেন।

ফাঁসির আদেশ

ফাঁসিরকাষ্ঠে হাস্যোজ্জ্বল ক্ষুদিরাম :
১১ আগস্ট, ১৯০৮। চারদিকে উত্তাল জনতা। মুজাফফরপুর জেলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। আর তখন জেলের ভিতরে হাসতে হাসতে ফাঁসির কাষ্ঠের দিকে এগোতে লাগলেন ক্ষুদিরাম। ভোর ৬টা। ১৮ বছরের তরুণ ইংরেজদের হুংকারকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সাদরে বরণ করে নিলেন মৃত্যুকে।

স্মৃতিতে ক্ষুদিরাম :
ক্ষুদিরামকে নিয়ে অনেক কবি, সাহিত্যক নানান কিছু রচনা করেছেন। কাজী নজ্রুল ইসলাম তাঁকে নিয়ে কবিতা, গান লিখেছেন।

তাঁর স্মরণে, ক্ষুদিরাম বোস সেন্ট্রাল কলেজ ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠি হয় কলকাতাতে। মুজাফফরপুর জেল নাম পালটে হয় ক্ষুদিরাম বোস মেমরিয়াল সেন্ট্রাল জেল। কলকাতার গড়িয়ায় মেট্রোরেল স্টেশনের নাম শহীদ ক্ষুদিরাম বোস স্টেশন করা হয়।

এছাড়া তাঁর স্মরনে রচিত হয় “একবার বিদায় দে মা” গানটি। যেখানে গানে গানে ক্ষুদিরামের জীবনের সংগ্রাম বর্ণিত আছে। স্বয়ং লতা মুঙ্গেশকর এই গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন।



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
11/1/B, Kobi Josimuddin Road, Uttor Komlapur,Motijheel, Dhaka-1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution