sa.gif

ইদ্রিস আলী থেকে ইলিয়াস কাঞ্চন
আ্ওয়াজ ডেস্ক :: 19:47 :: Tuesday December 24, 2019 Views : 133 Times

তাঁর জীবনের গল্পটি ফিল্মি। পর্দায় অনেক সময় যেমন দেখা যায়। তিলে তিলে গড়ে ওঠেন যেমন গল্পের নায়ক। ইলিয়াস কাঞ্চন তেমন সত্যিকারের নায়ক। দিনের পর দিন সংগ্রাম করে, শিখে, বুঝে, শুনে তিনি নায়ক হয়েছেন। সামাজিক চলচ্চিত্রে তাঁকে যেমন মানিয়ে যায়, তেমনি লোক গল্প, রোমান্টিক এমনকি অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রে নানা সময়ে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তাঁর শুরু করা আন্দোলন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে।

আজ এই গুণী অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। পারিবারিক নাম ইদ্রিস আলী। বাবা আবদুল আলী, মা সরুফা খাতুন। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই কাকরাইলে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ কার্যালয়ে সময় কাটাচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিসচা কার্যালয়ের উদ্যোগে কেক কেটে তাঁর জন্মদিন উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেক কাটবেন ইলিয়াস কাঞ্চন। জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর একটি প্রতিকৃতি এঁকেছেন শিল্পী প্রসূন হালদার। সন্ধ্যায় এটি উন্মোচন করবে নাতি ফায়জান মিরাজ কাঞ্চন।


১৯৭৫ সালে কবি নজরুল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন কাঞ্চন। স্কাউটিং করতেন। স্কাউটের ক্যাম্প ফায়ারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। স্কুলে নাটক করেছিলেন মামা-ভাগনের ভাগনে চরিত্রে। তাঁর ভাগনে চরিত্রটি দেখে দর্শক হাততালি দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি’তে রবীন্দ্রসংগীতে তালিম নেন। শিখেছেন নাচও।

স্কুলে ‘বাংলার মুক্তি’ নাটকে নায়িকার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। শিক্ষকেরাও তাতে অভিনয় করেছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে গঠিত ‘সৃজন সংঘ’ থেকে নাটক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, চলচ্চিত্রে আসার বিষয়ে তাঁর কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। বিষয়টা হুট করে হয়।

বলেন, ‘আমি তখন পুরান ঢাকায় থাকি। ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে একটা মঞ্চনাটক করি। সেই নাটকে প্রধান অতিথি ছিলেন সুভাষ দত্ত। তিনি আমার কাছাকাছি এলাকায় থাকতেন, ওয়ারীতে। মনে আছে, ওয়াপদা মিলনায়তনে নাটকটি দেখে আমাকে সুভাষদা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বলেন। পরদিন সকালে ওয়ারীতে দেখা করার পর তিনি সুসংবাদ দিলেন। যদি পরিবারের কোনো আপত্তি না থাকে, আমাকে নিয়ে তিনি ছবিতে কাজ করতে চান। ১৯৭৭ সালে ওটা আমার প্রথম কাজ। আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটির নাম ছিল ‘বসুন্ধরা’।


মনে পড়ে ‘বসুন্ধরা’ ছবির জন্য ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ উপন্যাসটি বাংলাবাজার থেকে কিনে পড়েছিলেন বারবার। ‘বসুন্ধরা’ ছবিতে কাজ করার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাঁকে। আর্ট কলেজে তিন মাস ক্লাস করতে হয়েছে। ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা আমাকে সব সময় সাহায্য করেছেন। বারবার সুযোগ দিয়েছেন। ভাগ্য আমার সহায় ছিল। “বসুন্ধরা” প্রথম এবং সাহিত্যনির্ভর ছবি। পরিচিতি আনার ক্ষেত্রে এই ছবির অবদান অনেক। এরপর সুপার-ডুপার ছিল “আঁখি মিলন” ছবির “আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে” গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। “ভেজা চোখ” ছবির “জীবনের গল্প, আছে বাকি অল্প” গানটিও আমাকে দর্শকের মনে অন্যভাবে ঠাঁই করে দেয়। এরপর “মাটির কসম”, “নীতিবান”, “সহযাত্রী”, “প্রেম প্রতিজ্ঞা”, “বেদের মেয়ে জোসনা”, “গাড়িয়াল ভাই”, “বাঁচার লড়াই”, “খুনি আসামি”—এমন অসংখ্য ছবি করেছি।’

বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্র সমালোচকেরা ইলিয়াস কাঞ্চনকে সব্যসাচী নায়ক ও অভিনেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁকে রোমান্টিকে ‘আঁখি মিলন’, ‘স্বজন’-এ মানিয়েছিল যেমন, তেমনি সামাজিক গল্পে ‘বন্ধন’, ‘অচেনা’, ‘শর্ত’, ‘আবদার’, ‘এই নিয়ে সংসার’, ‘অন্ধ ভালোবাসা’, ‘সুখের ঘরে দুঃখের আগুন’, ‘শেষ রক্ষা’, ‘দরদি সন্তান’, ‘চরম আঘাত’, ‘ভাইবন্ধু’তে সাবলীল লেগেছে। ‘ভেজা চোখ’-এর মতো বিরহ বা ‘বিদ্রোহী সন্তান’, ‘বিদ্রোহী আসামি’, ‘গুপ্ত ঘাতক’, ‘পেশাদার খুনি’, ‘সেই তুফান’, ‘আমার আদালত’, ‘কালপুরুষ’, ‘খুনি আসামি’, ‘মুন্না মাস্তান’, ‘আজকের শয়তান’, ‘আজকের বাদশা’তে, লোকনির্ভর যেমন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘রাজার মেয়ে পারুল’, ‘আয়না বিবির পালা’, ‘গাড়িয়াল ভাই’, ‘ঘর ভাঙা ঘর’, ‘শাহী কানুন’, ‘দুঃখিনী বধূ’ কিংবা ‘শয়তান জাদুকর’, ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘রূপনগরের রাজকন্যা’তে, সাহিত্যভিত্তিক ছবিতে ‘বসুন্ধরা’, ‘ডুমুরের ফুল’, শাস্তি’ ছবিতে মানিয়ে গেছেন দারুণভাবে। এভাবে বৈচিত্র্যময় হয়েছে তাঁর ক্যারিয়ার।
বানিয়েছেন, ‘বাবা আমার বাবা’ ও ‘মায়ের স্বপ্ন’। পরে আর পরিচালনা করা হয়নি। বলেন, ‘এখন আর সাহস পাই না। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে সব সময় ষড়যন্ত্র হয়েছে। প্রথম আঘাত এনেছিল পাইরেসি। এরপর অশ্লীলতা। এভাবে খুব সূক্ষ্মভাবে ষড়যন্ত্র করে ছোট হয়ে যায় আমাদের চলচ্চিত্রের বাজার। কমে গেছে সিনেমা হল। এখন তো সিনেমা হল নেই। যা আছে, তার দেড় শ হল কন্ট্রোল করে একটি প্রতিষ্ঠান! আজিজ সাহেবরা, মানে জাজ মাল্টি মিডিয়া। এখন ছবি বানালে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুরোধ করে রিলিজ দিতে হবে, সেটি আমি পারব না।’

বর্ণাঢ্যময় অভিনয়জীবনে কোনো অতৃপ্তি মনে পড়ে? ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন যেখানে অবস্থান করছে, এমন সময়ে অভিনয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমি যখন পরিপূর্ণতা অর্জন করেছি, ঠিক তখন অভিনয় থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে, এটাকেই আমার অতৃপ্তি মনে হয়। এর বাইরে আমার আর অন্য কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। দাদা, নানা হয়েছি।’

চলচ্চিত্র নিয়ে প্রত্যাশা কী? ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘চলচ্চিত্র ছেড়ে যেতে আমার ইচ্ছে করে না। আমার বিশ্বাস এবং মনে-প্রাণে প্রত্যাশা করি, চলচ্চিত্রের সংকট কেটে যাবে। আবার সুদিন আসবে। আমরা যারা পুরোনো হয়ে গেছি, নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও সবাই অভিনয়ে ফিরব। অভিনয় করতে করতে চলে যেতে চাই। এই দেশের চলচ্চিত্রে অনেক গুণী মানুষ রয়েছেন। তাঁদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেলে আমাদের একটা অনন্য প্রজন্ম গড়ে উঠবে।’

কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে মন খুব খারাপ হয়। আসলে আমি চলচ্চিত্র ছাড়া থাকতে পারি না। ৪১ বছর কম নয়। এতগুলো দিন যেখানে, যাদের সঙ্গে কেটেছে, তাদের ছাড়া থাকা যায়? আমার প্রযোজকেরা, নির্মাতারা, আমার প্রিয় চমৎকার নায়িকারা, সহশিল্পীরা, প্রতিটি ছবির টিম সদস্যরা আমার কাছে অনেক ভালোবাসার। অনেকের সঙ্গে আজকাল যোগাযোগ নেই। কারও কারও কথা হঠাৎ মনে পড়ে। অনেকে চলে যাচ্ছেন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে, কষ্ট পেয়ে নীরবে কাঁদি। রাজ্জাক ভাই, রাজীব ভাই, বন্ধু মিজু আহমেদ চলে গেলেন। চলচ্চিত্রের মানুষদের কথা খুব মনে পড়ে।’

ইলিয়াস কাঞ্চনের সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ইফতেখার চৌধুরীর ‘বিজলী’। এ ছবির নায়িকা ছিলেন ববি। এর আগে ‘হঠাৎ দেখা’ নামের একটি ছবি মুক্তি পায়। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। যৌথ প্রযোজনার এই ছবিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতা অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন রেশমি মিত্র ও সাহাদাত হোসেন।

চলচ্চিত্র এবং নায়ক চরিত্রের বাইরে আরেক দুনিয়ার নায়ক হয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীকে হারিয়ে নেমেছিলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে। সেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এখনো। এভাবে কেটে গেছে ২৬ বছর। তাঁর সংগঠনের নাম এখন জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে।

ইলিয়াস কাঞ্চন যখন এই আন্দোলন শুরু করেন তখন তাঁর চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ার তুঙ্গে। সে সময় এমন একটি আন্দোলনের জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘জাহানারার মৃত্যুতে আমি মারাত্মক ভেঙে পড়েছিলাম। এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে ঠিক করেছিলাম, আর কোনো ছবিতে অভিনয় করব না। সেই সময়ে পাশে এসে দাঁড়ান একজন সিনিয়র সাংবাদিক। তিনি আমাকে বোঝালেন। মনে আছে তাঁর কথাগুলো।’
তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো কাঞ্চন, স্ত্রীকে বাঁচাতে না পারায় তুমি খুবই ভেঙে পড়েছ। তাই হয়তো তুমি এমন চিন্তা করছ, চলচ্চিত্র ছেড়ে দেবে। কিন্তু এটি তো কোনো সমাধান হতে পারে না। হাজার হাজার ভক্ত তোমাকে ভালোবাসে। তাদের মধ্যে অনেকে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। যদি পারো তো তাদের জন্য কিছু করো।’ ওই সাংবাদিক ভাইয়ের কথাগুলো মনে ধরেছিল। তখন মনে হলো, ছেলেমানুষি করে নিজের জীবিকার উৎস যে অভিনয়, সেটি থেকে সরে দাঁড়ানো মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাতে কেবল নিজেকেই কষ্ট দেওয়া হবে। অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীর যে নির্মম পরিণতি হয়েছে, সে রকম পরিণতি বরণ করে নিতে হতে পারে অনেক ভক্তকেও। এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে গিয়ে প্রথম ১৫ দিন সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কথা বলিনি। নিজে নিজে ভেবেছি। আসলে কী করতে যাচ্ছি আমি, কী করা উচিত। একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার।’ইলিয়াস কাঞ্চন। 

প্রথম দিনের কর্মসূচির স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘প্রথম কর্মসূচির জন্য ডিসেম্বর মাসকে বেছে নিয়েছিলাম। ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর এফডিসি থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত পদযাত্রা বের করি। সেই পদযাত্রায় প্রচুর জনসমাগম হয়েছিল। তবে অধিকাংশ মানুষই যতটা না এসেছিলেন নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে, তার চেয়েও বেশি আমাকে ভালোবেসে। এরপর থেকে যখনই কোনো কর্মসূচির আয়োজন করেছি, সাধারণ মানুষের অফুরান ভালোবাসা পেয়েছি।’

ইলিয়াস কাঞ্চন ২০১৮ সালে একুশে পদক পেয়েছেন। একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও তিনি বাচসাস পুরস্কার, শেরেবাংলা স্মৃতি পদক, চলচ্চিত্র দর্শক পুরস্কার, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার, ঢাকা সিটি করপোরেশন নগর পুরস্কার, ভয়েস অব আমেরিকা পুরস্কার, বাংলাদেশ কালচারাল মুভমেন্ট পুরস্কার, ঢাকা যুব ফাউন্ডেশন পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন।

সুত্র .জাগো



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution