sa.gif

ইলা মিত্র: কৃষক আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় নাম
অজয় রায় :: 14:12 :: Friday December 20, 2019 Views : 431 Times

৪০ এর দশকের কিষাণ-কিষাণীদের উত্তাল ‘তেভাগা আন্দোলন’, যা শুরু হয়েছিল চল্লিশের দশকের গোড়াতে আর শেষ হয়েছিল ‘৫০ এ। অর্থাৎ এর স্থায়িত্ব ছিল মোটামুট এক ডিকেড বা এক দশক বা ১০ বছর। তবে ১৯৪৬-৪৮ কালপর্বে এই আন্দোলনের তীব্রতা উঠেছিল তুঙ্গে। বস্তুত এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল ‘কৃষক সমিতি’, যা গড়ে তুলেছিলেন সেকালের সংগ্রামী সাধারণ কিষাণ-কিষাণীরা। আর আন্দোলনে নেতৃত্বদান বা পরিচালনা করেছিলেন সমিতির নেতৃবৃন্দ।

আর তারা সবাই ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিক্ষিত সমাজের ডি-ক্লাসড হওয়া তথাকথিত সুধীসমাজ, যারা সাধারণভাবে পরিচিত ছিলেন ভদ্রলোক বা ‘বাবু’ হিসেবে। বিস্তারে যাওয়ার আগে এই তেভাগা আন্দোলনের একটি রূপরেখা অর্থাৎ চরিত্র তুলে ধরতে চাই। মূলত এই আন্দোলন উত্তর বাংলাতেই তীব্র রূপ ধারণ করেছিল- যেমন মালদহ, দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, পাবনা …. এবং খুলনা, যশোর, মাগুরা, ২৪ পরগণা, সাতক্ষীরা অঞ্চলে এর বিস্তৃতি ঘটতে থাকে ক্রমশ। পরে বরিশাল জেলাতেও এর প্রভাব অনুভূত হতে থাকে।


একটু বয়স্ক শ্রেণির পাঠকরা জানবেন যে সে সময়কার অর্থাৎ মোগল শাসিত বা পরে ইংরেজ শাসিত বাংলায় (বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি) ভূমি বণ্টন ব্যবস্থায় সমগ্র ভূমি ন্যাস্ত ছিল কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপর, যাদেরকে বলা হতো জমিদার বা জমির মালিক (Landlord); তবে তারা, জমির মালিক হলেও সরাসরি কৃষি বা ফসল ফলানোর জন্য জমি কর্ষণ বা চাষের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না।

তারা কেবল জমির মালিক হওয়ার সুবাদে শাসককে (মোগল বা ইংরেজ) বার্ষিক বা নির্ধারিত পর্বান্তর (ষাণ্মাষিক, চতুর্মাসিক, ত্রৈমাসিক ……) ধার্যকৃত অর্থ প্রদান এবং সাথে নানা প্রকৃতির মূল্যবান ভেট বা উপহার প্রদান করতেন। এই উপহার সামগ্রীতে অশ্ব, হস্তিসহ প্রাণিজ সম্পদও অন্তর্ভুক্ত থাকতো। আমাদের কালে বাংলাদেশে বেশ ক’জন জমিদার ছিলেন, যেমন দিনাজপুরের খ্যাতনামা রাজবংশ পরিবার।

মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বংশের প্রথম পুরুষ ছিলেন রাজা শুকদেব রায়। রাজা হিসেবে শুকদেব রায়ের আবির্ভাব কাল ছিল ১৪৪২-১৬৭৭ খ্রিষ্টাব্দ। [১] সে সময় বাংলায় মোগল সুবেদাররা ছিলেন শাহসুজা, মীরজুমলা, শায়েস্তা খান প্রমুখ।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা জমিদার বংশ, টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদার বংশ, সাতক্ষীরার প্রাণনাথ জমিদার বংশ …. প্রমুখ। এই জমিদারেরা জমিতে কৃষিকাজ বা চাষের উদ্দেশ্যে তাদের অধীনে সমগ্র জোত-জমাকে কতিপয় বিত্তবান বর্ধিষ্ণু এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করতেন এই শর্তে যে, তারা কৃষি বা চাষযোগ্য জমি চষে ফসল ফলাবেন উপযুক্ত ও সক্ষম চাষি দ্বারা লাঙলের মাধ্যমে জমি কর্ষণ করিয়ে।

এই শ্রেণির ব্যক্তিবর্গকে বলা হয় জোতদার, যারা দক্ষ কৃষক বা চাষি নিয়োগ করে জমি চাষ করাতেন ফসল ফলানের উদ্দেশ্যে। জোতদাররা হলেন মাটির সাথে সম্পৃক্ত। দরিদ্র কিন্তু সক্ষম কৃষকরা জোতদার বাবুর কাছ থেকে জমি লিজ নিতো জমিতে ধান, পাট এবং অন্যান্য ফসল ফলানোর জন্য, তবে ধানই ছিল মূল ফসল।

দুই ধরনের প্রথা সক্রিয় ছিল। একটি হলো আধিয়ারী প্রথা, এই প্রথায় জোতদার বাবু কৃষকে শুধু জমিই লিজ দিতেন না, দিতেন লাঙল, মই, কোদাল, ধানের সাথে উৎপাদিত আগাছা পরিষ্কার করার জন্য এক ধরনের নিরানী নামের ক্ষুদ্র যন্ত্রও। নিরানী হলো ক্ষুদ্র চারা ধানের সাথে থাকা আগাছাকে সরিয়ে ফেলার যন্ত্র।

দু’ধরনের প্রথায় সংশ্লিষ্ট কৃষক ও জোতদারের মধ্যে ধান বণ্টনের অনুপাত নির্ধারিত হতো। একটি প্রথার নাম আধিয়ারি। এই প্রথানুযায়ী উৎপাদিত ফসলে কৃষক জোতদারের বণ্টন অনুপাত হলো ১:১, অর্থাৎ মোট ফসলের অর্ধেক পাবেন জোতদার, আর বাকি অর্ধেক পাবেন সংশ্লিষ্ট কৃষক।

এজন্যই এই প্রথাটির নাম ‘আধিয়ারি’, যা অর্ধেক শব্দ থেকে উদ্ভূত। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কৃষক ‘আধিয়ার’ নামে অভিহিত হতেন। এই প্রথা সাধারণভাবে সারা উত্তরবঙ্গে পরিব্যাপ্ত ছিল।

অপর প্রথাটির নাম ছিল ‘বর্গা’ বা বরগা প্রথা। এই প্রথানুযায়ী জমির মালিক বা জোতদার কোনো ব্যক্তি বিশেষকে অস্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি লিজ দিতে পারেন এই শর্তে যে নির্ধারিত পরিমাণ শস্য রাজস্ব হিসেবে সেই ব্যক্তি জোতদারকে প্রদান করবেন। এইভাবে প্রাপ্ত জমির মালিককে বলা হয় ‘বরগাদার’ বা বর্গাদার।

৪০ এর দশকের জমিদার এবং জোতদারদের, খাজনা তোলার নাম করে দরিদ্র ও নিঃস্ব কৃষকদের ওপর নেমে আসে অমানবিক অত্যাচার-নিপীড়ন-নিষ্পেষণ, যা বর্ণনাতীত। জোতদাররা তাদের নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনি দিয়ে আধিয়ারদের ওপর এই অত্যাচার পরিচালনা করতো।

ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ বাহিনিও জোতদারদের এই কুকর্মে সাহায্য করতো। সেই সময়কার পুলিশ বাহিনী জনগণের কাছে ‘লালপাগড়ি’ বাহিনী কথিত হতো। কারণ, ব্রিটিশের পুলিশদের মাথায় থাকত লাল-পাগড়ি। কৃষকদের ওপর জোতদারদের অত্যাচার ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পেতে একপর্যায়ে সীমা ছাড়িয়ে গেলে আধিয়াররা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং কৃষক সমিতির নেতৃত্বে সঙ্ঘবদ্ধ হয়।

এরা আধিয়ার প্রথার বিরূদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের বেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পেতে ১৯৪৬-৪৮ কালপর্বে তীব্রতর হয়ে ওঠে। কৃষকরা দাবি তোলে যে কৃষক কর্তৃক উৎপাদিত শস্যের কৃষক:জোতদার বণ্টন অনুপাত ১:১ এর পরিবর্তে এই অনুপাত হতে হবে ৩:১। অর্থাৎ উৎপাদিত শস্যের তিন ভাগ যাবে কৃষকের ঘরে আর বাকি একভাগ শস্য পাবে জোতদার বাবু।

একটি কাল্পনিক উদাহরণ দেয়া যাক; ধরা যাক জনৈক কৃষক ৬০০ মণ ধান উৎপাদন করলো, তাহলে কৃষক: জোতদার বণ্টন অনুপাত ৩:১ অনুযায়ী জোতদার পাবেন (১/৩) ৬০০ অর্থাৎ ২০০ মণ আর সংশ্লিষ্ট কৃষক পাবেন (২/৩) ৬০০ অর্থাৎ ৪০০ মণ। উল্লিখিত কারণে উত্তরবঙ্গে এই আন্দেলন পরিচয় পায় তেভাগা আন্দোলন নামে।

দিনাজপুর শহরে ছোটবেলায় এই আন্দোলনের রূপ এর প্রকৃতি আর চরিত্র আমি প্রত্যক্ষ বা অবলোকন করেছি। যেমন ১৯৪৬ এর কথা বলি, তেভাগা আন্দোলন তখন তীব্রতার শিখরে। আমি তখন স্থানীয় জুবিলী স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বয়স ১০/১১।

দেখেছি দড়ি বাঁধা অবস্থায় দলে দলে কৃষক আর কিষাণীদের শহরে নিয়ে আসতে গ্রাম থেকে। জেলে স্থান হচ্ছে না। শৃঙ্খলিত অবস্থায় থানার আশেপাশে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে। নাওয়া নেই খাওয়া নেই। স্বেচ্ছাসেবক দল তাদের দেখভাল করছে সাধ্যমত। এইসব শৃঙ্খলিত নারী-পুরুষদের জামিনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন শহরের নামকরা মানুষজন যেমন বরদা ভূষণ চক্রবর্তী, নিশিত নাথ কুণ্ডু, কৃষকনেতা কমরেড হাজী দানেশ, জনপ্রিয় সমাজসেবী ও সৎসঙ্গ নেতা অতুল চন্দ্র রায় (আমার পিতৃদেব)।

আমার দিব্যি মনে আছে দিনাজপুর বা উত্তরবঙ্গে ৪০ এর দশকে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন: গুরুদাস তালুকদার (আমার জেঠু), রূপনারায়ণ রায়, বিভুতিভূষণ দে, আমরা কাকু বলে ডাকতাম, আমার পিতৃদেবের বিশেষ বন্ধু, কংগ্রেস কর্মী রজনী কান্ত রায়, আমার মাতৃদেবীর বিশেষ স্নেহভাজন, পঞ্চগড় এলাকার দ্বিজেন রায়, নিজে জোতদার হলেও তেভাগা আন্দোলনের একজন নেতা ছিলেন, চিরিরবন্দর এলাকার দীপেন্দ্র সরকার।

আর ছিলেন দিপ্তীময়ী নাচোলের সাঁওতাল আর কৃষাণ কিষাণীদের রানী ইলা মিত্র। ইলা মিত্রের ওপর রাজশাহী জেলে তখনকার পকিস্তান সরকার যে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছে তা শুধু নির্মম নয় অমানবিকও বটে। অত্যাচারের একটি নমুনা বলি, রাজশাহী জেল কর্তৃপক্ষ সজ্ঞানে ইলা মিত্রের যোনীর অভ্যন্তরে উত্তপ্ত সিদ্ধ ডিম প্রবেশ করিয়ে ইলা মিত্রের তীব্র যন্ত্রণা দেখে জেলের কারাকর্তৃপক্ষের সদস্যরা উল্লাসে ফেটে পড়ত। উল্লেখ্য যে, ইলা মিত্রের স্বামী ছিলেন রমেন মিত্র। তিনিও ছিলেন কৃষক নেতা, নাচোল এলাকার জমিদারপুত্র।

আমি ইলা মিত্রকে প্রথম দেখি ১৯৫৩ সালে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রাজশাহী জেল কর্তৃপক্ষের অমানুষিক নিপীড়নে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লো, পাক-সরকার তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে চিকিৎসার জন্য। ড. আলম বলে একজন বিজ্ঞ সার্জন ইলা মিত্রের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। ক্রমেই ডা. আলমের সাথে ইলামিত্রের সখ্যতা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

আমি প্রায় প্রতিদিনই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতাম, আর হুইল চেয়ারে বসিয়ে হাসপাতাল সংলগ্ন বাগানে তাকে ঘোরাতাম, এর ফলশ্রুতিতে তাঁর সাথে স্নেহসিক্ত ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে অচিরেই। তখনকার মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে পাকিস্তান সরকার ইলা মিত্রকে মুক্তি দিতে রাজি হয় এক শর্তে যে, তিনি পাকিস্তান ছেড়ে কলকাতায় (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) চলে যাবেন। তাঁর কলকাতা যাত্রার সাথী ছিলেন তার বন্ধু সুহৃদ ড. আলম, ড. আলম নাচোলের রাণীকে কলকতায় পৌঁছে দিয়ে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। প্রসঙ্গত বলি, তেভাগা আন্দোলন যশোর জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যাপকভাবে। সে আরেক কাহিনি।

তেভাগা আন্দোলন নিয়ে বিষেশ রচনাটি একতায় লিখেছিলেন, পদার্থ বিজ্ঞানী “অধ্যাপ অজয় রায়” তার স্বরণে লেখাটি প্রকাশ করা হলো।



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution