sa.gif

শ্রমিক অধিকার দেশ দেশে : যাঁদের ত্যাগ ঋণি করে
মো. জাহিদ হাসান :: 12:58 :: Wednesday June 10, 2020 Views : 200 Times

আমি তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় কাজ করতে করতে আজ শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কাজ করি। একজন ত্যাগি বিদেশি শ্রমিক নেতা কিভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছিল আজ আমি সেই কথা বলবো।

১৯৯২ সাল থেকে চাকুরী করেছি মিরপুর-২ সেক্টরে এন গার্মেন্টস চাকুরী করেছি। তারপর ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরের ১৫ মালয়েশিয়ায় তারপর গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করার ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়ায় চলে যায়। সেখানে ছিয়া মুন গার্মেন্টস কাজ করি। কারখানাটি ছিল মালয়েশিয়া পেনাং শহরে। সেখানে বেশ কিছু দিন কাজ করতে পারিনি।
পরে আমাকে দালালের মাধ্যমে চায়না মালিকের কাছে দেওয়া হয়। কারখানাটি একটি কাঠের কারখানা, স মিলের কাঠ কাটা। কারখানাটি আইনি কি সব সমস্যা ছিল। এর মধ্যেই সেখানে কাজ করি। শুধু খাওয়ার জন্য টাকা দেয়া হতো। একদিন মালয়েশিয়ার পুলিশ অভিযান চালিয়ে কাঠকাঠা কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। তারপর চায়না মালিক আমাকে হস্তান্তর এক কয়েল কারখানায়। সেখানেও আমাকে শুধু খাওয়ার টাকা দিতো। রাতে ঘুমাতে হত মালিকের বারান্দায়। ঘুইসাপ ঘোরা-ফেরা করতো, রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আর রাতে ঘুমাতে না পারার কারণে দিনে কাজ করতে পারতাম না। শরীরও দুর্বল হয়ে যেতে লাগলো। এরপর সেই চায়না মালিক বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করলো মালশিয়ার পাহাং পাহাড়ে। এ সব কথা বলার উদ্দেশ্য হলো বিদেশে গিয়ে আমরা কি অবস্থায় থাকি।
পাহাংয়ে কাজ ছিল সবজি ক্ষেতে পানি দেয়া। পাহাড়ের ঢালে সবজির চাষ করা। পানি দেয়া থেকে পুরো কৃষি কাজ মোটামুটি ভালই পারছিলাম। ওই মালিক আমাকে বলল, অনেক দিন তো কাজ করেছো। আমি তোমার কাজে হ্যাপি। তুমি বাংলাদেশে কি কাজ করতে? আমি বললাম গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতাম। কিন্তু ওই চায়না মালিক আমার কথা বুঝতে পারে না।
পরের দিন মালিক আবার জিজ্ঞাসা করেন। কিন্তু আমি মালিককে বোঝাতে পারি না। পরে আমার পাশের বাগানে কাজ করেন বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার এক ভাই। তাকে ডেকে আনতে বলেন। আমি তাকে ডেকে আনি। আমার কথা বাংলাদেশি ভাইকে দিয়ে জিজ্ঞাসা করান, দোভাষীর কাজ করে নারায়নগঞ্জের ওই ভাই। আমি বাংলাদেশি ভাইকে জানায় আমি বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেছি। দোভাষীর মাধ্যমে আমার মালিক আমার সম্পর্কে অবগত হয়।
একদিন মালিক বললো তোমাকে মালয়েশিয়ার আমপাং শহরে যেতে হবে। মালিকের নির্দেশ মত আমি সেখানে চলে গেলাম, আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু আমপাং শহরে আমার কোন কাজ নেই; ঘরে অনেকটা বন্দীর মত থাকতে লাগলাম। কিছুদিন পরে আমি নিজেই কাজের সন্ধানে বের হলাম। এবং খোঁজা খুঁজি করতে করতে এক চায়না মালিকের কাছে একটি কাজ পেয়ে যায়। সেটি ছিল ব্যাগ তৈরির কারখানা।
এখানে জীবনের সব চেয়ে অভিজ্ঞতাটি হয়। একই দেশের মালিকের খারাপ আচরন, কিন্তু তার স্ত্রী লি মিন ছিলেন মানবিক। ব্যাগ তৈরী কারখানায় কাজ করার পাশাপাশি থাকারও ব্যবস্থা করলেন মালিক। ব্যাগ তৈরির কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আমাকে একটু সমস্যায় পড়তে হয়। আমি ওই কাজে অভ্যস্ত নই। কাজ করতে একটু দেরি হয়। এ জন্য মালিক আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। নতুন কাজ করতে আমাকে একটু সময় দেওয়া হচ্ছিলো না। কিন্তু মালিকের স্ত্রী মালিকের খারাপ ব্যবহারের প্রতিবাদ করে।
মালিক বদমেজাজী ছিল। মালিকের স্ত্রী আমার প¶ে কথা বলায় সেখানে মালিক এবং মালিকের স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হয়, সংসারে ঝামেলা শুরু হয়। আমি পড়ে গেলাম বেকায়দায়। আমি এখন কি করতে পারি –চিন্তা করতে লাগলাম। একদিন মালিক যখন কারখানা থেকে বের হয় মালিকের স্ত্রী আমাকে বলে তুমি আজ বা কাল বাংলাদেশ হাইকমিশনার এর কাছে যাবে। এখানে যে সমস্যা হয় তা সেখানে বুঝিয়ে বলবে। তাহলে তোমার সমস্যা সমাধান হবে। তিনি বাংলাদেশ হাই কমিশনের ঠিকানাও আমাকে দিয়ে দিলেন।
আমি অবাক হলাম ¯^ামী নির্যাতন করছে, খারাপ ব্যবহার করছে। আর স্ত্রী আমাকে সহায়তা করছে। ইতোমধ্যে আমি ভাষা কিছু বোঝা শুরু করেছি। আমিও বুঝিয়ে বলতে পারি। বিষয়টি আমি জানতে চাইলাম, কেনো আমাকে তিনি সহায়তা করছেন। তখন মালিকের স্ত্রী বললেন তিনি শ্রমিকনেতা ছিলেন। কিন্তু এখানে কিছু করতে পারছি না। এই কারখানার মালিক তার ¯^ামী। তবে রাস্তা তো দেখাতে পারবো। এ জন্য এই রাস্তা দেখালাম। কিন্তু আমাকে শর্ত দিয়ে দিলো আমি কোনভাবেই মালিককে এ কথা রবলতে পারবো না।
মালিকের স্ত্রীর পরামর্শ মত আমি সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনে গেলাম। সেখানে অভিযোগ করে আসলাম। কারখানায় যে সমস্যা হয় তা বিস্তারিত জানিয়ে এলাম। অভিযোগ করে আসতে না আসতেই কাজ শুরু হয়ে গেলো। আমার মালিক আর মালিকের স্ত্রী আমাকে ডাকলেন, সাথে মালশিয়ার পুলিশ।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম কি করলাম, আর কি হলো। আমাকেই বুঝি ধরতে এসেছে। আমার মুখ কালো হয়ে গেল। মালিকের স্ত্রী আমাকে ডেকে হাসি দিয়ে বলল, কোথায় গিয়েছিলে? চুপ হয়ে রইলাম। পরে বলে ভয় নাই, এসে বসো। পুলিশ, মালিক, আমি এবং মালিকের স্ত্রী বসে কথা বলে আমার কাজের সমস্যার সমাধান হলো।

বেশ কাজ করতে থাকি পরে মালিক আমাকে ডেকে বলে জাহিদ, তোমাকে নিয়ে আমরা চিন্তায় থাকি। তুমি দেশে চলে যাও। এর মাঝে আরও অনেক কিছু হয়েছে যাই হোক। আমি বাংলাদেশ আসলাম। তখন ১৯৯৯ সাল।

দেশে এসে বেশ কিছু দিন কোন চাকরি-বাকরি করিনি। বাড়িতেই বসে ছিলাম, পারিবারিক কাজ-কর্ম করি। শেষে পাশাগেটে চাকরি নিলাম। চাকরি করতে করতে মনে পড়ে গেলো মালশিয়ার শ্রমিক নেতার লে মিনের কথা। যে নারী আমাকে অধিকার আদায় করতে শিখিয়েছিলেন, মানবিক হতে শিখিয়েছিলেন। একজন শ্রমিক নেতা হলে শ্রমিকের প্রতি কতটা দরদি হতে হয় তা তিনি শিখিয়েছিলেন। ¯^ামীর কারখানাতে শ্রমিক হিসাবে আমার অধিকার আদায় করিয়ে দিতে হলে শ্রমিকের প্রতি কেমন দরদি হতে হয়, কেমন সাহসি হতে হয় এবং একই সাথে ত্যাগি হতে হয়ে। লি মিন আমাকে সে সব শিক্ষা দিলেন। চোখ বন্ধ করে একবার সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর, গাজীপুর বা নারায়নগঞ্জে এমন একজন স্ত্রীর কথা ভাবি তো , যিনি কোন কারখানা মালিকের স্ত্রী। তিনি শ্রমিক নেত্রী ছিলেন।
দেশে এসে কারখানায় যোগদান করার পর আমার মনে হলো শ্রমিকদের অধিকার আদায় করতে হলে শ্রমিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে হবে। যোগাযোগ করে পেলাম শ্রমিক সংগঠন। পরিচয় হলো শ্রমিক নেতা, জাতী শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক রায় রমেশ চন্দ্র দাদার সঙ্গে। তার পরামর্শ মত আমি গাজীপুরের দায়িত্বে থাকা শ্রমিক নেতা জলিল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এর কালিয়াকৈর উপজেলা শাখা কমিটির দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে থাকি। কাজ করতে করতে আমাকে ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শ্রম আইনের বিষয়ে বিভিন্ন টেনিং দেওয়া হয়। শ্রমিক অধিকার আদায় করতে হলে শ্রম আইন ও আরও যে সব বিষয় জানা প্রয়োজন, আমি সে সব বিষয়গুলো আগামী পর্বে লিখবো।



 


Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
11/1/B, Kobi Josimuddin Road, Uttor Komlapur,Motijheel, Dhaka-1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution