sa.gif

সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি ও দেশীয় উঠতি পুঁজির নির্মম শোষণে বিপর্যস্ত গার্মেন্টস শ্রমিকরা
সুুদীপ্ত শাহীন :: 23:05 :: Saturday September 28, 2019 Views : 574 Times


গার্মেন্টস সেক্টরের গত নিম্নতম মজুরির গেজেট ঘোষণা হওয়ার পর সারাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের উপর নির্যাতন ও শোষণ বৃদ্ধি পায়। এ প্রেক্ষিতে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে মিছিল-মিটিংসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ নালিশ জানাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে আইনি প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। তবে গার্মেন্টস খাতে সম্প্রতি তীব্র শোষণ নির্যাতন বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও মালিক সংগঠনের পক্ষ হতে বিভিন্ন রকম বক্তব্য আসছে। এ সমস্ত বক্তব্যের কোন কোনটির মধ্যে আংশিক সত্য থাকলেও সামগ্রিক বাস্তবতা প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মুক্তির লক্ষে্য তথা তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব ও বিভ্রান্তি থাকছে। এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান থেকে এ বিষয়ে সা¤্রাজ্যবাদী একচেটিয়া লগ্নি পুঁজি ও দেশীয় পুঁজির স্বরুপ উন্মোচন করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের প্রতি তাদের করণীয় প্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা দরকার।


গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের প্রকৃত স্বরুপ তুলে ধরতে হলে নয়া-ঔপনিবেশিক দেশগুলোর উপর সা¤্রাজ্যবাদী বিভিন্ন সংস্থা ও একচেটিয়া পুঁজির বিভিন্ন আধিপত্যমূলক বাণিজ্য নীতি ও বিধি-বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া দরকার। সা¤্রাজ্যবাদী সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রণীত এসব বাণিজ্য নীতির সুরক্ষা দ্বারাও প্রথম দিকে বহুজাতিক কোম্পানির সমূহের অন্য রাষ্ট্রে বাণিজ্য শুরুর ক্ষেত্রে শর্ত ছিল- স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরকে সহযোগিতা করা, স্থানীয় পর্যায়ে থেকে জনগণ ও কাঁচামাল সংগ্রহ করা, স্থানীয় লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং বিনিয়োগকৃত রাষ্ট্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর করা। কিন্তু একচেটিয়া পুঁজির মালিকরা এসব শর্ত অমান্য করেছে। একচেটিয়া পুঁজির ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলো নিজেদের ট্রেডমার্ক তৈরি করে এবং দীর্ঘ মেয়াদেও জন্য ট্রেডমার্কের সুবিধা সিন্ডিকেট করে রাখে। এছাড়া পণ্যস্বত্ব বা প্যাটেন্টের সিন্ডিকেটের মাধ্যমেও বিভিন্ন সুবিধা লাভ করে। সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির চাপে নয়া ঔপনিবেশিক দেশের মুৎসুদ্ধি পুঁজির সরকার শুল্ক সীমা কমিয়ে দিয়ে বিদেশি পুঁজিকে স্বাগত জানানোর জন্য বিশেষ রপ্তানি অঞ্চল স্থাপন করে। দেশীয় আইন কানুন ও বিধি-বিধান শিথিল করে এবং শ্রম মানদন্ড কমিয়ে দেয়। শুল্ক হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে নন বেরিয়ার বা শুল্ক সংশ্লিষ্ট নয় এমন ধরনের বাধাসমূহ দৃশ্যমান হয়ে উঠে। এ ধরনের বাধাসমূহের মধ্যে রয়েছে টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড বা প্রযুক্তিগত মানদন্ড, এমনকি সরকারি পরিসেবা খাতও। যেগুলোতে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাসমূহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং অন্যান্য খাতে তাদের বিনিয়োগ থেকে সর্বোচ্ছ মুনাফা হাতিয়ে নিতে নয়া- ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় তহবিল বন্ধ প্রদান করার বিষয়ে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ আরোপ করছে। নয়া ঔপনিবেশিক দেশ হিসেবে আমাদেও দেশের মুতসুদ্ধি পুঁজির প্রতিনিধিত্বকারী সা¤্রাজবাদের দালাল সরকারকেও উল্লেখিত বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে এবং বিনিয়োগ বন্ধ করার হুমকি দিয়ে একচেটিয়া পুঁজি বহুমুখী চাপে রেখেছে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক শিবির শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণে পুঁজিবাদী-সা¤্রাজ্যবাদী পুঁজির বিস্তার সীমিত হয়ে যায়। এর ফলে বিভিন্ন পদ¶েপ সামনে আনে একচেটিয়া পুঁজির মালিকরা। এর মধ্যে একটি হলো "ফোর্ডবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা" কে সামনে আনা। যেমন- আধা-দক্ষ শ্রমিকদের পরিচালনায় মুভিং অ্যাসেম্ব^লি লাইন টেকনিক অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহার দ্বারা গুণগতমান সম্পন্ন ব্যাপক উৎপাদন ও মুনাফা বৃদ্ধি করা। "ইকোনমিস অব স্কেল" অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খরচ বাঁচিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।


কিন্তু ১৯৬০-র দশকেই পুঁজিবাদী অর্থনীতি অতি উৎপাদন সংকটে পতিত হয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও মুনাফা অর্জনের হার কমতে থাকে। এর ফলে একচেটিয়া পুঁজির তথাকথিত "ফোর্ডবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার" অসারতা প্রকাশ পায়। ১৯৭০-র দশকে বিশ্ববাসী "তেল সংকট" ও "স্থবির অর্থনীতি" প্রত্যাশা করেছে । এই স্থবির অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির উপর তখন বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। এই অবস্থায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সামষ্টিক অর্থনীতি (ম্যাক্রো-ইকোনমিক) ব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্য একচেটিয়া পুঁজি উদ্বৃত্ত শ্রম ও সস্তা চামালের ব্যবহারের সুবিধার্থে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার(ডব্লিউটিও) মাধ্যমে এশিয়া আফ্রিকার নয়া-উপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশগুলোতে পুঁজি বিনিয়োগ বাড়াতে থাকে। এসব দেশগিলতে সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল পেয়ে ১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকেই একচেটিয়া পুঁজির মুনাফা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে থাকে। এর ফলে একচেটিয়া পুঁজি ফুলে-ফেঁপে উঠে পুঁজির কেন্দ্র্রিভবন আরো বাড়াতে থাকে। এ সময়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান-ওইসিডি কর্তৃক পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী বিশ্ব বাণিজ্যের পণ্য সংক্রান্ত ব্যবসার কমপক্ষে ৬০ শতাংশ এবং এর সাথে আর্থিক সেবা খাতকে যুক্ত করলে এর পরিমাণ ৮০ শতাংশের এরও বেশি একচেটিয়া পুঁজির মালিকরা নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যেও আরো নির্দিষ্ট কয়েকজনের কাছে এই প্রভাব ও ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে।

সম্প্রতি মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী শ্রমিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি) একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে- একশটি রাষ্ট্রের কাছে সম্মিলিতভাবে যত সম্পদ রয়েছে কেবল ৫০ টি কোম্পানির কাছেই সেই সম্পদ রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের গবেষকদের মতে - বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের জরিপকৃত ৪৩,০০০ বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে কেবল সাতশত গ্রুপ অফ কোম্পানি মোট কোম্পানিগুলোর শতকরা ৮০ ভাগকে কে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ১৪৭টি কোম্পানি হচ্ছে সুপার সত্তা অর্থাৎ যাদের হাতে রয়েছে মূল ক্ষমতা। তারা মোট বহুজাতিক কোম্পানির শতকরা ৪০ ভাগকে কে নিয়ন্ত্রণ করে। এই ক্ষমতাধর গ্রুপের কোম্পানিগুলো তাদের নিজেদের দেশের এবং নয়া ঔপনিবেশিক দেশের সরকারি সংস্থাগুলিকে করায়ত্ত করার রাজনৈতিক ক্ষমতা ধারণ করে। ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগ অঞ্চলগুলোর মধ্যে কোন অঞ্চলে সস্তা জমি, অবকাঠামো খাতে ভর্তুকি, মজুরি ও চাকুরির শর্তে নমনীয়তা ও ছাড় এবং ইউনিয়ন এড়ানোর সুযোগ পাবে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় যতটা নিচে নামা যায় অর্থাৎ গুণগতমান ও শ্রমিক অধিকার কে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রচুর মুনাফা করা যায় সেইসব অঞ্চলেই এসব একচেটিয়া পুঁজির মালিকরা বিনি য়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সাথে এই একচেটিয়া পুঁজির কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ধারিত কর প্রদান না করায় করের বোঝা শ্রমজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়।


সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাসমূহের এসব নীতি নির্দেশে আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রকৃতি, বাণিজ্য নীতি ও বিধি-বিধান এমনভাবে প্রণীত ও পরিবর্তন করা হয়েছে- যার ফলে বায়ার বা ক্রেতা গোষ্ঠী দেশীয় সাপ্লাই বা সরবরাহকারীর ক্ষমতার ভারসাম্য হীনতার মাধ্যমে বরাবরই আধিপত্য তৈরি করে রাখছে। গার্মেন্টস খাতে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে  বায়ার বা ক্রেতাদের দুটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়- একটি হলো বায়ার বা ক্রেতা কর্তৃক তাদেও পোশাক উৎপাদনকারী সাপ্লাইয়ার বা সরবরাহকারী কারখানাগুলোকে মূল্য কম দেওয়া, দ্বিতীয়টি হলো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সীমা (লীডটাইম) সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া। যেখানে বায়ার বা ক্রেতা গোষ্ঠী দিন দিন আরো কম সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করার জন্য কারখানাগুলোকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এসবের ফলে বায়ার, ক্রেতা ও দেশীয় সরবরাহকারীরা শ্রমিকদের জীবনের দুর্ভোগ দিনকে দিন আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষভাবে নারী ও মেয়েরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্রেতা গোষ্ঠী কর্তৃক পণ্য মূল্য কমিয়ে দেওয়ার অজুহাতে দেশিয় মালিকরা ভবন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট উদাসীন থাকছে। দেশিয় সরবরাহকারী গোষ্ঠী অধিক মুনাফার জন্য ভবন নিরাপত্তা খাতে খরচ কমাতে গিয়ে কারখানা স্থাপনের জন্য সস্তা মূল্যের নিম্নমানের ভবন খুঁজে বের করে। শ্রমিক সংখ্যার অনুপাতে বড়ে ভবন এর পরিবর্তে ছোট ভবনে কারখানা স্থাপনের কারণে শ্রমিকদেরকে গাদাগাদি করে কাজ করতে হয়। যার ফলে কারখানার পরিবেশ হয় অত্যন্ত নিম্নমানের। অস্বাস্থ্যকর ও বিপদজনক কর্মপরিবেশ, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার, বায়ু চলাচলের সঠিক ব্যবস্থা না থাকা, অগ্নি দুর্ঘটনার ঝুঁকি ইত্যাদি তৈরি হয়।

সুুদীপ্ত শাহীন: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ,  ময়মনসিংহ জেলা। 



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution