sa.gif

আখের মূল্য ও আখ চাষিদের বাঁচা-মরার সংগ্রাম
নিতাই চন্দ্র রায় :: 12:58 :: Tuesday May 12, 2020 Views : 293 Times

আখ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র অর্থকরী ফসল। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায়   আড়াই থেকে তিন   লাখ একর জমিতে আখের চাষ হয়। আখ চাষের সাথে দেশের    লাখ লাখ চাষির জীবন-জীবিকা জড়িত । দেশে বর্তমানে ১৫ টি  সরকারি চিনিকল রয়েছে।এই সব চিনিকলে কৃষক সরকার নির্ধারিত মূল্যে আখ সরবরাহ করেন।  আগে আখ সরবরাহের সাথে সাথেই মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে আখের মূল্য  পরিশোধ করা হতো। কিন্তু গত দু’টি মাড়াই মৌসুম থেকে কৃষক  মিলে আখ সরবরাহ করে সময় মতো আখের মূল্য পাচ্ছেন না। এতে আখ চাষে কৃষকের আগ্রহ  হ্রাস পাচ্ছে। আখ একটি দীর্ঘ মেয়াদী ফসল। রোপণ থেকে কর্তন পর্যন্ত ১২ থেকে ১৪ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়।  তারপরও সেই আখ বিক্রি করে কৃষক যদি সময় মতো মূল্য না পান , তাহলে  কে করবে আখ চাষ ? চিনিকল এলাকার কৃষক শুধু আখ চাষই করেন না। আখের সাথে সাথি ফসল হিসেবে  ডাল, তেলবীজ, শাক-সবজি  এবং  মসলা জাতীয় বিভিন্ন  ফসলেরও  আবাদ করেন । আখ বিক্রির টাকা দিয়েই কৃষকে নতুন রোপণকৃত আখের  পরিচর্যা করতে হয়। আগাছা দমন, উপরি সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ প্রদানসহ বিভিন্ন কাজে কৃষকদের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।  এক একর জমিতে আখ চাষ করতে কমপক্ষে  ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা কৃষি শ্রমিকের পেছনেই খরচ হয়। তাই সময় মতো আখের মূল্য না পেলে কৃষক কীভাবে আখের পরিচর্যা করবেন? কীভাবে সংসার চালাবেন? আর কীভাবেই বা করবেন  অন্য ফসল; গম , বোরা ধান, ভূট্টা মাড়াই ও বরি ফসল তোলার কাজ? আখ বিক্রির টাকা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মিটাতে হয় অনেক কৃষকের। করোনার প্রভাবে এমনি কৃষক অনেক কষ্টে দিন যাপন করছেন , তারমধ্যে  ২ থেকে ৩ মাস আগে সরকারি চিনি কলে  আখ বিক্রি করে কৃষক  আখের মূল্য না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বিভিন্ন চিনিকলের মিলগেটে কৃষক আখের মূল্য প্রদানের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন।  মানববন্ধন করছেন। স্মারককলিপি প্রদান করছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
দক্ষিণ অঞ্চলের একমাত্র ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জের মোবারকগঞ্জ চিনিকলের শ্রমিক কর্মচারিদের বকেয়া বেতন ও চাষিদের আখের মূল্য পরিশোধসহ পাঁচ দফা দাবিতে  প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্বারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল, মিলের শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে  প্রধানমন্ত্রী বরাবর  এই স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, মিলের শ্রমিক কর্মচারিদের গত তিন মাসের পাঁচ কোটি ৭২ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।  এছাড়া সদ্য সমাপ্ত মাড়াই মৌসুমের কৃষকদের আখের মূল্য বাকি রয়েছে  ১৯ কোটি ২২ লাখ টাকা।  করোনা সংকটে মিলটি বকেয়া বেতন ও আখের মূল্য পরিশোধ না করায় শ্রমিক কর্মচারি ও আখ চাাষিগণ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিষয়টি নিয়ে করপোরেশনকে বারবার অবহিত করার পরও কোনো  প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
 শুধু মোবারক চিনিকল কেন? শ্রমিক-কর্মচারিদের বকেয়া বেতন এবং আখের মূল্য পরিশোধের দাবিতে পাবনা, জয়পুরহাট, শ্যামপুর, কুষ্টিয়া ও রংপুর চিনিকলে   আখ চাষি এবং শ্রমিক-কর্মচারিদের বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অব্যাহত রয়েছে। যতদূর জানা যায়,   লালপুরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে  আখ সরবরাহকারী ১৭ হাজার আখ চাষির মিলের কাছে পাওনা রয়েছে ৪১ কোটি টাকা। ওই চিনিকলের আব্দুলপুর গ্রামের  আইয়ুব হোসেনহ একাধিক আখ চাষি জানান, এক গাড়ি আখ মিলে সরবরাহ করতে আখ কাটা ও পরিবহন বাবদ এক হাজার টাকার প্রয়োজন হয়, যা আখ বিক্রির টাকা থেকে পরিশোধ করা হতো। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আখের মূল্য না পাওয়ায় অধিক সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ  কী দুভাগ্য! কৃষক আখ বিক্রি করে তার নিজের টাকাও পাচ্ছেন না।
জানা যায়, চিনি বিক্রি না হওয়ার কারণে চিনিকলগুলি শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন ও আখ চাষিদের আখের মূল্য প্রদান করতে পারছে না। বর্তমানে বেসরকারি  চিনি পরিশোধন কোম্পানীগুলি  প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করছে ৫০ টাকা কেজি দরে। আর  সরকারি চিনিকলের প্রতি কেজি চিনির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ টাকা। বাজারে  ৫০ টাকা কেজিতে চিনি পাওয়া গেলে ৬০ টাকা কেজিতে চিনি বিক্রি হবে কীভাবে?
 বাংলাদেশে বার্ষিক চিনি চাহিদা ১৬ লাখ মেট্রিকটন। ২০১৯-২০ মাড়াই মৌসুমে ১৫ টি চিনিকলে  ১৪ লাখ ১ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৮২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করা হয়েছে। গত বছর চিনি উৎপাদন হয়েছিল ৬৮ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের চেয়ে এ বছর ১২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন বেশি চিনি উৎপাদন হয়েছে।  এ বছর চিনিকল এলাকায় আখ চাষ হয়েছে  ১ লাখ ২৮ হাজার একর জমিতে। এখন আখের জমিতে আগাছা দমন, সেচ, উপরি সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করার  উপযুক্ত সময়। টাকার অভাবে কৃষক আখের জমিতে পরিচর্যা করতে পারছেন না।এতে আখের ফলন হ্রাস পেলে চিনিকলগুলি কম আখ পাবে এবং উৎপাদন ব্যাহত হবে।
গত রোপণ মৌসুমে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশেনের সাবেক চেয়ারম্যান অজিত কুমার পাল চিনিকলগুলিতে বিভিন্ন সভায় আখ চাষিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, আখ সরবরাহের সাথে সাথে আখের মূল্য পরিশোধ করা হবে।কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। চিনিকল বন্ধের দীর্ঘ দিন অতিবাহিত  হওয়ার পরও চাষিরা আখের মূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন।চিনি বিক্রি হলো কি না হলো, তার সাথে তো আখের মূল্য প্রদানের বিষয়টি সম্পর্কিত  হতে পারে না।কৃষক সরকারি চিনিকলে আখ সরবরাহ করেছে, তাঁকে সময় মতো আখের মূল্য পরিশোধ করতে হবে- এটাই বাস্তবতা।এটাই নির্মম সত্য।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চিনিকল আখ চাষি ফেডারেশেনের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, কথা ছিল  এক হাতে আখ সরবরাহ করবে আর  এক হাতে আখের মূল্য পাবেন আখচাষি। ১৫ টি চিনিকলের নিকট আখ চাষিদের পাওনা রয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা। করোনার প্রভাবে এমনিই কৃষক নানা সমস্যায় জর্জরিত, তারমধ্যে সময় মতো আখ বিক্রির টাকা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন মিলজোন এলাকার  হাজার হাজার কৃষক।এটা কারো কাম্য হতে পারে না। পাবনা চিনিকলে আখের মূল হিসেবে আখ চাষিদের পাওনা রয়েছে  ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ওই চিনিকলের  বাঘইল গ্রামের একজন  প্রগতিশীল আখ চাষি  নজরুল ইসলাম  বিশ্বাস বলেন, আখ বিক্রি করে এক মাস ধরে বিল না পাওয়ার কারণে  জমিতে অন্য ফসলের আবাদ করতে পারছেন না।  পারছেন না নতুন রোপণ করা আখের জমিতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে। রাজশাহী চিনিকলে সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ মাড়াই মৌসুমে মাত্র ৯১ দিনে চিনি উৎপাদন হয়েছে সাড়ে চার হাজার মেট্রিক টন, যা অবিক্রিত হয়ে আছে এবং চাষিদের পাওনা রয়েছে  ১৬ কোটি টাকা।  অন্যদিকে নাটোর চিনিকলের ১০ হাজার আখ চাষির চিনিকলটির নিকট আখের মূল্য হিসেবে পাওনা রয়েছে ১৩ কোটি টাকা। শ্যামপুর চিনিকলে আখ চাষিদের  পাওনার পরিমাণ ২ কোটি টাকা। জয়পুরহাট চিনিকলে আখের মূল্য বাকি রয়েছে  ১৫ কোটি টাকা এবং রংপুর চিনিকলের চাষিদের আখের মূল্য হিসেবে পাওনা রয়েছে  ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা।এ ছাড়া অন্যান্য চিনিকলেও আখ চাষিদের পাওনা রয়েছে   বেশ কয়েক কোটি টাকা ।যেসব চিনিকল মৌসুমে শেষের দিকে বন্ধ হয়েছে সেসব চিনি কলেই চাষিদের পাওনা টাকার পরিমাণ বেশি।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার যেখানে নানা প্রণোদনা  প্রদান করছে, সেখানে   আখ চাষিরা কেন তাদের বিক্রি করা আখের মূল্য সময় মতো পাবেন না? এটা আমাদের বোধগম্য নয়।  সরকারের নীতি নির্ধারকদের উচিত করোনা সংক্রমণের এই ভয়াবহ সময়ে  আর বিলম্ব না করে শিগগির আখের মূল্য পরিশোধ করা। প্রতি বছরের ন্যায় বাজেট বরাদ্দ থেকে আখ চাষের ভর্তুকি প্রদান করা ।  প্রতিটি মিলে আখ চাষের জন্য সার ও কীটনাশক সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেয়া।সেচ, পোকা ও রোগ দমনসহ বিভিন্ন  আন্তঃপরিচর্যা কাজে  শতকরা ৪ ভাগ সুদে আখ চাষিদের নগদ ঋণ প্রদান করা।তাহলেই কৃষকেরা আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আখের ফলন বাড়াতে সক্ষম হবেন এবং উৎপাদিত আখ চিনিকলগুলিতে সরবরাহ করবেন। এতে আখ চাষি ও চিনিকল উভয়ই লাভবান হবে।বাজারে চিনির মূল্য ভোক্তাদের  সামর্থের মধ্যে থাকবে। খরা, বন্যা জলোচ্ছাসে অন্য ফসল  সম্পূর্ণ বিনষ্ট হলেও আখ একেবারে নষ্ট হয় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আখ কৃষককে বেঁচে থাকার ভরসা জোগায়। এজন্য আখকে বলা হয় বীমাকৃত ফসল। আখের মূল্যের সাথে আখ চাষিদের বাঁচা-মরার সংগ্রাম জড়িত। আমাদের মনে রাখা উচিত - আখ চাষিরাও এ দেশের মাটি ও মানুষের সন্তান। তাঁদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। অধিকার আছে সময় মতো বিক্রিত  আখের মূল্য পাওয়ার ।  
নিতাই চন্দ্র রায়
সাবেক মহাব্যবস্থাক(কৃষি)
নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
11/1/B, Kobi Josimuddin Road, Uttor Komlapur,Motijheel, Dhaka-1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution