sa.gif

মে দিবসের চেতনার ধারায় শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে
এম এ শাহীন :: 10:58 :: Friday May 1, 2020 Views : 212 Times

১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। সারা দুনিয়াতে যথাযথ মর্যাদার সহিত এই দিবসটি উদযাপিত হয়। বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে আমাদের দেশে এবারের মে দিবস উদযাপন হবে ভিন্ন আঙ্গিকে।

 

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিকদের উদ্যোগে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে স্বল্প পরিসরে কারখানার সামনে বা রাস্তার মোড়ে সভা ও মানববন্ধনে মিলিত হচ্ছে অথবা ঘরোয়া পরিবেশে আলোচনা সভা কিংবা শ্রমজীবি মানুষ প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে ১ মিনিট নিরবতা পালন করে মহান মে দিবসের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মাধ্যমে উদযাপিত হবে।

 

১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকরা ৮ ঘন্টা কর্মদিবস, ন্যয্য মজুরি ও অধিকার আদায়ে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রচিত হয় শ্রমিক শ্রেণীর ঐতিহাসিক এক লড়াই সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

 

যারপর থেকে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে পরিণত হয়। এই দিনে সারা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণী সভা সমাবেশ মিছিল এবং নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরে, পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে মুক্তির জন্য বিপ্লবী ধারার লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তোলার শপথ গ্রহণ করে, বিশ্বের শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সংহতি ঘোষণা করে।

 

"দুনিয়ার মজদুর এক হও" শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। এই দিনটিকে আমাদের দেশে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির উদ্দেশ্যে অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আদর্শ হিসেবে নিতে হবে।১৮৮৬ সালের মে মাসে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা যে রক্তক্ষয়ী ও আত্মত্যাগী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেদিন শ্রমিক শ্রেণীর বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলো সেই সত্যটি আজ চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনে মহান মে দিবসকে আজ একটি নিছক উৎসব আনন্দের দিনে পরিণত করা হচ্ছে। বিশ্ব খ্যাত মে দিবসের যে মর্ম বাণী ও চেতনা তা উপলব্ধিতে নিয়ে এ দেশের শ্রমজীবী মানুষ যাতে পূঁজিবাদী অপকৌশলের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস না পায় এবং শোষক গোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচার-নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে শ্রমজীবি মানুষের মাঝে যাতে বিদ্রোহ করার মনোভব সৃষ্টি না হয় তার জন্য পূঁজিবাদীরা কৌশলগত ভাবে মে দিবসের চেতনাকে আড়াল করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।

 

আমাদের পূঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মালিক শ্রেণি কৌশলগত ভাবে প্রচার প্রোপাগান্ডা চালিয়ে মে দিবসের চেতনা কে আড়াল করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে এটাকে শুধু'ই একটি উৎসব আনন্দের দিন হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা চালিয়েছে। আমাদের দেশের কিছু রাজনৈতিক সংগঠন ও নামধারী শ্রমিক সংগঠন যারা কখনো শ্রমজীবি মানুষের কোন প্রকার সংকটে পাশে দাঁড়ায় না বা শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যাদের রাজপথে দেখা যায় না তারা পূঁজিবাদীদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী মে দিবসকে ভিন্ন ভাবে শ্রমিকদের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ট্রাকে করে মিউজিক সেট নিয়ে শ্রমিকদের কে নাচ-গানে উল্লাসে মগ্ন রেখে প্রকৃত বিষয়টাকে চাপা দিতে চাইছে।

 

যে লক্ষ্য নিয়ে মে দিবস ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো তা আজও আমাদের দেশের শ্রমিকরা অর্জন করতে পারেনি। মে দিবসের ১৩৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও এদেশের শ্রমিকরা মে দিবসের সুফল পায়নি। তারা আজও ৮ ঘন্টা কাজ, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার বঞ্চিত, শোষিত-নির্যাতিত এবং অগণতান্ত্রিক কালাকানুনের শৃঙ্খলে বাঁধা পরে রয়েছে।

 

বাংলদেশ পূর্বে পাকিস্তান সময়ে ২২ পরিবারের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষ শোষণ মুক্তির সংগ্রাম করেছে। মুক্তিযুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছে কিন্তু শোষণের হাত থেকে মুক্তি পায়নি। এখন স্বাধীন দেশের মালিকরা স্বাধীন ভাবে এদেশের শ্রমিকদের মাত্রাতিরিক্ত শোষণ-নির্যাতন করে চলেছে। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে সস্তা শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে তারা একটা কারখানা থেকে একাধিক কারখানার মালিক হয়েছে।

 

দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে অথচ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে তারা কোন কাজ করেনি। শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মক্ষেত্রে জীবনের নিরাপত্তা, বাসস্থান, রেশন ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ কোন সুযোগ সুবিধা তারা দিচ্ছে না। পাকিস্তান সময়ের শোষকদের যে কারখানা ছিলো আদমজী জোট মিল, লতিফ বাওয়ানী জোট মিল, এসব কারখানায়ও তখন শ্রমিকদের জন্য কলোনী ছিলো, হাসপাতাল ছিলো, রেশন দেওয়া হতো, শ্রমিকের সন্তানদের লেখা-পড়া জন্য স্কুল-কলেজ ছিলো, বিনোদন কেন্দ্র ও খেলার মাঠ ছিলো। সেই সব সুবিধা থেকেও এখন স্বাধীন দেশের গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিকদের বঞ্চিত করছে।

 

করোনা দুর্যোগের মধ্যে শ্রমিকদের দায়িত্ব নেওয়ার পরিবর্তে বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে উল্টো ছাঁটাই লে-অফ করে তাদের মৃত্যু ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এটাই প্রমাণ করে যে সু-সংগঠিত শক্তি প্রদর্শন তথা বিপ্লবী ধারার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলা ছাড়া মালিক গোষ্ঠীর শোষণ-নির্যাতন অন্যায়-অত্যাচার থেকে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সম্ভব নয়।

 

পূঁজিবাদী ধনীক শ্রেণীর শাসন ব্যবস্থা শ্রমিক আন্দোলনকে ধ্বংস ও বিপথে পরিচালিত করার জন্য রাষ্ট্রের পুলিশ, বিজিবিসহ সর্বশক্তি ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনা। সুতরাং বিশ্ব খ্যাত মে দিবসের যে মর্ম বাণী ও চেতনা তা উপলব্ধিতে নিয়ে পূঁজিবাদের হিংস্রতম কৌশলী আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীকে রুখে দাঁড়াতে হবে।

শ্রমজীবি মানুষকে অধিকার সচেতন করে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে তিব্র লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে পূঁজিবাদের এই কৌশলী আক্রমণ রুখে দিতে হবে। এই বিশাল শক্তিকে মোকাবেলা করতে প্রয়োজন শ্রমিকের ঐক্য ও শক্তিশালী সংগঠন। শ্রমিকের রক্তে লেখা ঐতিহাসিক সংগ্রামের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবারের মে দিবসের শপথ হোক এদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও শোষণ মুক্তির। সারাদুনিয়ার সকল দেশের শ্রমজীবি মানুষ যে ৮ ঘন্টা শ্রম সময় ভোগ করে তা ঐ মহৎ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস খ্যাত মে দিবসের ফসল।


এই প্রাপ্তি শুধু শ্রমজীবি জনগণই ভোগ করে না সকল মানুষের মাঝেই তা বন্টিত হয়েছে। সকলেই ৮ ঘন্টা শ্রম অধিকার এবং সেই সাথে শ্রমিক শ্রেণীর লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত নানা ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারগুলোও ভোগ করছে । সেই জন্য ৮ ঘন্টা কর্মদিবসের দাবি শুধু শ্রমিকদের সংকীর্ণ শ্রেণী স্বার্থের দাবি ছিলো না বরং তা ছিল এক মানবিক কর্মপরিবেশের সর্বজনীন অধিকারের অনুরণন। যার ফলে শ্রমজীবী মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রাম এক নতুন প্রেরণা লাভ করে। তাই সারা দুনিয়ার শ্রমজীবি মানুষ মে দিবস পালনের মাধ্যমে "মে" শহীদের স্মৃতিকে চিরঞ্জীব করেছে। মহান মে দিবসে সেই মহৎ ঐতিহ্যের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জনাই।

এম এ শাহীন: সভাপতি-নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি।
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
11/1/B, Kobi Josimuddin Road, Uttor Komlapur,Motijheel, Dhaka-1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution