sa.gif

জীবন যুদ্ধের এক গার্মেন্টস কর্মী-সীমার গল্প
সাহাব উদ্দিন :: 09:57 :: Thursday March 7, 2019 Views : 614 Times


বাংলাদেশকে আজ সারা দুনিয়ার মানুষ চেনে। বিশ্ব মোড়লরা বাংলাদেশকে হিসাব করে। বিন্দুমাত্র স্বীকার করতে  দ্বীধা নাই যে তৈরি পোশাক এবং ক্রিকেট খেলার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের এই পরিচিতি। তবে আজকের আলোচনার বিষয় ক্রিকেট নয় তৈরি পোশাক শিল্প। তবে কার বা কাদের হাত দিয়ে এই অগ্রযাত্রা বা উন্নতি ? এক কথায় বলা যায়- একক কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, সকলেরে প্রচেষ্টার ফল হল, মেডইন বাংলাদেশ। তাদের মধ্যে অন্যতম হল  কেউ গ্রাম থেকে উঠে আসা কষ্ট-পীড়িত অসহায় দরিদ্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী শ্রমিক। তাদের অতীত যে কত করুন, কত যে ত্যাগের কাছে থেকে অনুধাবন না করলে বোঝা বড়ই মুসকিল।

সীমা তাদের মধ্যে এক অন্যতম। লালমনিরহাট মধ্যবয়াতী গ্রামে যার জন্ম। তার বাবা মো: আলম, তিনি অনেকটাই জন্ম সূত্রে শারীরিক ভাবে কর্ম অক্ষম। তার এক পা আরেক পায়ের চেয়ে কিছুটা ছোট হওয়ার কারণে ভারী এবং কঠিন পরিশ্রমের কাজ করা কোন ভাবে তার পক্ষে সম্ভবপর নয়। জীবনের তাগিদে বাস্তবতার নিরিখে যতটুকু কাজ  করে সংসার চালানো যায় তা যতেষ্ট নয়। ওই সংসারে  দুই বোন ও দুই ভায়ের মধ্যে সীমাই সব চেয়ে বড়। বাবার এই অক্ষমতার কারণে মাঝে মধ্যেই অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটাতে হয় পরিবারের সকল সদস্যকেই। এাবেই চলছিল দিন। হঠাৎ আবার এক হৃদয় বিদারক সংবাদ । খুড়িয়ে খুড়িয়ে কাজের সন্ধানে বাড়ী থেকে বের হতেই রাস্তায় রাস্তায় ঘটে দুর্ঘটনা। পুঙ্গ বাবা আরও পুঙ্গ হয়ে যায়। কিভাবে সহ্য করা যায় এই কষ্ট। সংসার চালানোর জন্য যতটুকু সাপোর্ট ছিল সেটাও আবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। এই মুহুর্তে শুধু দু‘চোখে অবিরাম বৃষ্টির ধারা ছাড়া কিছুই তার নেই।  চারিদিকে শুধু ঘন আঁধার আর আঁধার ।

বাবার কর্ম অ¶মতার কারণে লেখা-পড়ার তেমন সুযোগ হয়নি। কে দিবে এই অর্ধ শিক্ষিত অনভিজ্ঞ মেয়েটিকে একটি কাজরে সন্ধান ! বয়স আঠার পেরিয়ে উনিশে পড়েছে মাত্র। চোখের সামনে কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বাবা-মা ও ছোট ভাই  বোনদের অনাহারে ও অর্ধহারে দিন কাটানো। তার এই বিপদের সময় সমাজের কোন বৃত্তবানই তেমন কোন কাজ আসেনি। এটাই নিয়ম আধাঁর যখন সন্নিকটে তখন নদীর পানিও শুকিয়ে যায়।

সীমা লোকে মুখে শুনেছে গার্মেন্টস এ চাকুরী করে গ্রামের অনেক মেয়েই আজ বেশ ভাল আছে। সেই চিন্তা থেকেই এক আত্মীয়র মাধ্যমে বাবা-মা ও ছোট ভাইবোনদের মুখে একটু হাসি ফোঁটানোর জন্যই বাড়ী থেকে বের হয় বাড়ি থেকে; এক অনিশ্চিত জীবন যুদ্ধে। আজ সবারই জানা গার্মেন্টস হলেও অশিক্ষিত এবং অনভিজ্ঞদের কর্মে প্রবেশ বেশ বড়ই কঠিন। তার পরও আল্লাহর বিশেষ রহমতে সে ময়মনসিংহ ভালুকার এক তৈরি পোশাক কারখানাতে ইনপুট হেলপার হিসেবে কাজ পায়। এভাবেই শুরু হল সীমার জীবন যুদ্ধ। মাস গেলে যে বেতন পায় তা নিজের খাওয়া, বাসা ভাড়া কিছু পোশাক কেনা ছাড়া বাকী টাকাটা মা-বাবা ও ছোট ভাই বোনদের জন্য  বাড়িতে পাঠায। বেশ চলছিল আগের চেয়ে কিছুটা হলেও ভাল।

হঠাৎ আবার এক হৃদয় চরম দু-সংবাদ। তার ছোট ভাইটি অসুস্থ হয়ে পড়ে, এখন অনেকটাই অসুস্থ। ডাক্তারের মাধ্যমে জানতে পারে স্নেহের এই ভাইটির ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। এই সংবাদ শোনার পর এই মেয়েটির চারদিক যেনো আরও অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে। তার বাবা আজ পুরোপুরি বিছানাগত, মাও দীর্ঘদিন যাবৎ জটিল ও কঠিন রোগে ভুগছে, এ দিকে আবার ছোট ভাইটির ব্লাড ক্যান্সার! বলুন কি ভাবে সহ্য করা যায় জীবন যুদ্ধের এই চরম বাস্তবতা !

২৮শে জানুয়ারী সকালে গ্রামের বাড়ীতে থেকে ফোন আসে। ফোন টি রিসিভি করতেই হাও মাও কওে কেঁদে ওঠে। আসলে কি হয়েছে ? জিজ্ঞেস করতেই জানায়  সেই ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ছোট আদরের ভাইটি তাকে ছেড়ে চিরকালের জন্য পরপারে চলে গেছে । আগের রাতেই তার ছোট ভাইটি মারা গেছে,বাড়ী থেকে তাকে জানানো হয়নি, এতরাতে কিভাবে ময়মনসিংহ থেকে লালমনিরহাট যাবে এই ভেবে! পরের দিন দুপুর একটাই জানাযার সময়ও নির্ধারন করা হয়েছে। কি ভাবে যাবে, চরম কষ্টের সাথে যুদ্ধ করা আদরের ছোট ভাইটিকে জীবনে শেষবারের মত এক পলক  দেখার জন্য, হাতে নাই টাকা। যদিও রাস্তা ভাড়ার টাকাটা কারো কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারলেও পারেনি সময়কে বশ করতে। কেননা ময়মনসিংহ থেকে লালমনিরহাট বেশ দুরের পথ। সময়ের কাছে হেরে যেতে হলো, যাওয়া হলনা ভাইটিকে শেষ বারের জন্য এক পলক দেখতে।  
এ গল্প সীমার জীবনের, একজন গার্মেন্টস কর্মীর জীবনের। যে কর্মী দেশের তৈরি পোশাককে সমৃদ্ধ করে। দেশকে বৈদেশিক মূদ্রা দেয়।  তবু আজও বেঁচে আছে লিপা মা-বাবা, আরও একটি ছোট ভাই ও  ছোট বোনটির জন্য। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। বেঁচে থাকতে হবে নিজে এবং তার পরিবারে জন্য।
তার বেঁচে থাকা ছোট ভাইটির নাম সুমন, বয়স ১৪। সে চেষ্টা করছে বিভিন্ন গার্মেন্টস এর গেটে গেটে চাকুরীর জন্য । বয়স ১৮ বছর না হওয়ার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। ছোট বোনটির বয়স ১০ বছর, ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ে, কষ্ট হলেও বোনটিকে একটু শিক্ষিত করার প্রত্যয়। লিপার নিজের বয়স হলেও নিজের বিয়ে নিয়ে নেই কোন ভাবনা-চিন্তা। সে যদি আজ সংসারী হয়, কে চালাবে তার মা-বাবা ও ভাই বোনকে ! লিপা আজ বাস্তবতাময় জীবনের অনেক বড় হিসাবের মুখোমুখি।

(ছবি ও নামটি রুপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে)



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution