sa.gif

বাংলাদেশে গার্মেন্ট কারখানা আর কখনোই মৃত্যুফাঁদ হতে পারে না
অরুণা কাশ্যাপ :: 20:35 :: Saturday February 2, 2019 Views : 189 Times

‘আমরা আরেকটি রানা প্লাজা চাই না’।
২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসের পর অলৌকিকভাবে বেঁচে যান বাংলাদেশী একজন গার্মেন্ট শ্রমিক। তার সঙ্গে যখন আমি কথা বলছিলাম, তখন এগুলোই তিনি আমাকে বলেছিলেন। ওই ভবনটিতে (রানা প্লাজা) ছিল ৫টি গার্মেন্ট কারখানা। আর সেখানে বাংলাদেশের কয়েক হাজার দরিদ্র শ্রমিক কাজ করতেন। ওই শ্রমিকের সঙ্গে আমি প্রায় এক বছর আগে হাসপাতালে সাক্ষাত করেছিলাম। সেখানে তিনি বিষন্নতা ও আতঙ্কের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন, আমি গার্মেন্ট শ্রমিক হতে চাই না।
এ কাজে ফিরে যেতে আমি ভীষণ আতঙ্কিত।
ওই ভবনটি ধসে পড়ার বেশ কয়েকদিন পরে তার ভিতর থেকে তাকে কিভাবে উদ্ধার করা হয় তিনি সেই ভয়াবহতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। ওইদিন যে ১১৩৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন তার মধ্যে রয়েছে তার সব বন্ধুবান্ধব। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ২০০০ মানুষ।
তার কথাগুলো দূরদর্শী হিসেবে দেখা যেতে পারে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি উদ্যোগকে দুর্বল করে দেয়ার মাধ্যমে ভুল করতে পারে বাংলাদেশ। রানা প্লাজা ধসের পরের বছরগুলোতে ওই উদ্যোগে নাটকীয়ভাবে অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তায় উন্নতি সাধিত হয়েছে।
২০১৩ সালের ওই বিপর্যয়ে বৈশ্বিক অ্যাপারেল ও ফুটওয়্যার ব্রান্ডগুলোকে লজ্জায় পড়ে যায় এবং তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। এক মাসের মধ্যে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি। এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, সিঅ্যান্ডএ এবং এসপ্রিটের মতো বেশির ভাগ ইউরোপীয় ব্রান্ডের মতো দুই শতাধিক ব্রান্ড বাধ্যতামূলক এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বৈশ্বিক ইউনিয়ন ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে। অন্যদিকে আমেরিকান ব্রান্ডগুলো পাশাপাশি সমানতালে চালু করে অবশ্যই পালিত হবে এমন নয় একটি উদ্যোগ, যার নাম অ্যালায়েন্স অন ওয়ার্কার সেফটি।
কিন্তু গত বছর বাংলাদেশের একটি প্রস্তুতকারক স্মার্ট জিন্স লিমিটেড অ্যাকর্ডকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একটি মামলা করে। মে মাসে বাংলাদেশ হাই কোর্ট অ্যাকর্ডের বিরুদ্ধে রায় দেন। এতে বলা হয়, অ্যাকর্ডকে নভেম্বরের শেষে তার কর্মকান্ড হস্তান্তর করতে হবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে। কিন্তু সরকারের রিমেডিয়েশন কোঅর্ডিনেশন সেল এখনও অ্যাকর্ডের ওই কাজ বুঝে নেয়ার মতো সরঞ্জামে সুসজ্জিত হয়ে প্রস্তুত নয়।
এ অবস্থায় অ্যাকর্ড সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে তাদের কর্মকান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে, আগে যেটা পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সাল পর্যন্ত ছিল। যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা থেকে এ সংস্থাটি অন্য কোনো উদ্যোগের দিকে অবস্থান নেয় নি। কারণ, এখনও কারখানাগুলো নিরাপদ নয়। তারা কারখানাগুলোর শক্তিশালী ব্যবসায়িক পরিণতির পক্ষে।
সতর্কতা ও বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরও যদি একটি কারখানা সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিয়ে কোনো অগ্রগতি না করে তাহলে অ্যাকর্ড তাদেরকে তাদের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ থেকে বাতিল করে। এর অর্থ হলো এমনটা করা হলে অ্যাকর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোনো ব্রান্ডই ওই বাতিল হয়ে যাওয়া কারখানার সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না। অগ্রগতির বিষয়ে এই কর্মসূচির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। অ্যাকর্ড শুধু দাঁতহীন আরেকটি নজরদারিমূলক কর্মসূচি নয়।
সরকার এসব নজরদারি ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগের বিষয়ে প্রস্তুত হওয়ার আগে যদি অ্যাকর্ড তার কাজ গুটিয়ে নেয় তাহলে এটা হবে তাদের জন্য একটি বিপর্যয়, যাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি হতে পারে কঠোর এবং তা পূর্বাভাষযোগ্য। বাংলাদেশে আরেকটি কারখানায় বিপর্যয় ঘটুক এমন ঝুঁকি নিতে পারে না বৈশ্বিক ব্রান্ডগুলো। কনজুমার, বিনিয়োগকারী ও শ্রম অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বৈশ্বিক অ্যাপারেল ব্রান্ডগুলোকে ঘায়েল করা শুরু করবে। তারা জানতে চাইবে অনিরাপদ কারখানা থেকে পোশাক কেনা হচ্ছে না এটা নিশ্চিত করতে তারা কি করছে। এমন প্রশ্নের উত্তর সহজ হবে না।
যদি এটাই ঘটে তবে বাংলাদেশী প্রস্তুতকারদের বড় রকমের ব্যবসায় লোকসানের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যদি আদালত ঢাকা থেকে অ্যাকর্ডকে তার কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে নিতে অনুমোদন না দেয় তাহলে অ্যাকর্ড ব্রান্ডের কাছ থেকে কমপক্ষে ৫০০ গার্মেন্ট কারখানা ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে। যদি কারখানাগুলো তাদের ব্যবসায় লোকসান খায় তাহলে বহু শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকবেন। যেসব কারখানা নিরাপদ নয়, সেখানে কাজ করার অর্থ হলো মৃত্যুকে এড়ানো যায়, এমন অনেক মৃত্যু ঘটতে পারে।
ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুর দিকে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকরা। কিন্তু সেই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ভেঙে দেয়া হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপজুড়ে যেসব ক্রেতা আছেন তারা এ সপ্তাহে গার্মেন্ট শ্রমিকদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেছেন বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর সামনে। তারা এসব বিক্ষোভ থেকে অ্যাকর্ডের কর্মকান্ডের মেয়াদ ও শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
অ্যাপারেল বা তৈরি পোশাক শিল্পের এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে যতদূর সম্ভব তা করা উচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। বার বার শ্রমিকদের যে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে তার একটি টেকসই সমাধান বের করা উচিত তার। বাংলাদেশের শক্তিশালী এ কারখানার সংগঠনের সঙ্গে তার সরকার ২০১৭ সালের অক্টোবরে একমত হয়েছিল যে, অ্যাকর্ডের কাজ ২০২১ সাল নাগাদ বর্ধিত করা উচিত। তাই তাদের উচিত অ্যাকর্ডের প্রতি শর্তহীন সমর্থন দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন করা এবং বলা যে-  শ্রমিক, বাংলাদেশী প্রস্তুতকারক ও বৈশ্বিক অ্যাপারেল ব্রান্ডগুলোর জন্য উত্তম স্বার্থের জন্য এটা করা উচিত।
অ্যাকর্ডের কাছ থেকে কাজ বুঝে নিতে রিমেডিয়েশন কোঅর্ডিনেশন সেলের কর্মক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য অনেক বছর সময় লাগবে। একসঙ্গে টেকসই একটি ‘এক্সিট প্লান’ প্রণয়নে বাংলাদেশ সরকার, শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন, ইউনিয়ন ও স্থানীয় গ্রুপগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করা হলো অ্যাকর্ডের স্বার্থ। প্রত্যেকেই একমত যে, অ্যাকর্ডের সফলতা নির্ভর করে টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য একটি ব্যবসার ওপর। এটা শুধু একটি সংক্ষিপ্ত রূপকথা হতে পারে না, যা শেষ হয় আতঙ্কের মধ্যে। তাই কেউই চান না আরেকটি রানা প্লাজা।



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution