sa.gif

তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ
(পর্ব-৪)
জাফর আহমদ :: 01:05 :: Sunday September 3, 2017 Views : 236 Times

-জ্বরের লাইগা দুইদিন তিনদিন অফিসে যাইতে পারিনি। জ¦র শারলে অফিসে যায়, টাইমকিপার কয় চাকরি নাই। কিন্তুক আমি তিনবছর ধইরা ওই কারখানা চাকরি করচি। কথাগুলো দ্রুততার সাথে বলে যায় মর্জিনা। বলার মধ্যে কারখানার টাইমকিপারের বিরুদ্ধে যেন আগুনের ফুলকি ঝরে পড়ছে। মনোযোগ দিয়ে শুনছে ইন্দ্রানি দাস। খাতাতে টুকিটাকি লিখে রাখছে। মাঝে-মধ্যে কিছু কথা জিজ্ঞেস করছে। 

-আগের মুতন এখন কি যকন-তকন চাকরি পাওয়ার উপায় আছে, বলে মর্জিনা।
-আপনে কি জ¦র হওয়ার সুময় অফিসে জানাইচিলেন, জানতে চায় ইন্দ্রানি।
-হা দিদি, জানাইচি। পয়লাদিনই অফিসে কাজ করার সুময় জ¦র জ¦র লাগচিল। সুপারভাইজারেক বুইলসিনু। হে কপালে হাত দিয়া কইলো একটু একটু জ¦র ঠিক হয়া যাইবো। তারপর বাসায় আইসা জ¦রে পড়ি। ভাল হওয়ার পর অফিসে গ্যালে কই এডমিনে যাও। এডমিনে গেলে কয়, না কয়া অ্যাপসেন্ট করেছো চাকরি না\
-কোন ডাক্তারের কাচে চিকিৎসা করাইচেন, সাটিফেবে দিবে?
- হ, দিবো। একটা সার্টিফিকেট নিয়া কাইল দুপুরে আইসেন, বলে ইন্দ্রানি। মর্জিনা বের হয়ে হয়ে যায়। এভাবে একেক জন আসে।
পনর বিশ ফুটের লম্বা একটি রুম। ভেতরের দিকে আরও একটি ছোট্ট রুম। এটি একটি ফেডারেশনের আঞ্চলিক অফিস। গাজীপুরের বোর্ড বাজারের সদর রাস্তা থেকে পূর্ব দিকে প্রায় হাফ কিলোমিটার হেটে এই অফিসে আসতে হয়। ভেতরের রুমে বসে মানুষের কথা শোনে ইন্দ্রানি। পাশে বসা রুমানা। শ্রমিক নেত্রী। আশুলিয়া থেকে এসেছে। এটা তার সাংগাঠনিক সফর। বাইরের বড় ঘরটিতে বার-চোদ্দজন যুবক-যুবতি বসে আছে। শরীর জুড়ে পরিশ্রম আর ক্লান্তির ছাপ। প্লাস্টিকের পাতলা চেয়ার সরিয়ে দুজন ছেলে-মেয়ে মুখোমুখি হয়ে গল্প করছে। এটা যেন শ্রমিকের নির্ভয়ের একটি স্থান। বিকেল থেকেই দুএকজন করে আসা শুরু করে, রাত ১০টা অবধি থাকে। সপ্তাহের ছয়দিনের একই চিত্র। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সবারই কোন না কোন সমস্যা। কেউ চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়েছে, ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করবে। কেউ অ্যাপসেন্ট করার কারণে কারণ দর্শানোর পেয়েছে জবাব দিবে, সহযোগিতা নিতে এসেছে। কোন নারী শ্রমিক মাতৃকালিন ছুটি থেকে আসার পর চাকরিতে যোগ দিতে পারছে না, এডমিন বলছে চাকরি নেই। কেউ গর্ভবতি হয়েছে জানতে পেরেই চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়েছে। আইনি সহযোগিতা চায়। সবাই গার্মেন্ট শ্রমিক। তারা বিভিন্ন কারখানায় চাকরি করে। রুমানার সাথে আসা আমিনও একজনের সাথে জমিয়ে গল্প শুরু করেছে।
ইন্দ্রানি প্র্রায় সবাইকেই বলে দিচ্ছে কারখানার অনিয়মের বিরুদ্ধে নোটিশ করতে হবে। নোটিশে সমস্যার সমাধান না হলে শ্রম আদালতে মামলা করতে হবে। কাউকে অপেক্ষা করতে বলছে আমি ভাই আসা পর্যন্ত, এ সমস্যা ফোনেই সমাধান হবে। কারো সমস্যা জটিল, অন্য কোন সমাধান প্রয়োজন, আইনজীবির পরামর্শ নিতে হবে। এ জন্য তাদের নির্দিষ্ট আইনজীবিও আছে। তিনি সপ্তাহের একদিন এসে শ্রমিকদের সাথে কথা বলে। জটিল সমস্যার সমাধান আইনজীবি দেবেন। ততক্ষন অপেক্ষা করতে হবে।
ইন্দ্রানি ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। বয়স ষোল-সতেরো হবে। সে নিজেও একবার ছাঁটাই হয়েছে, এখান ফুলটাইম কাজ করে। চটপটে, শ্রমিক দরদি, মেট্রিক পর্যন্ত লেখাপড়াও করেছিল। শ্রম আইন সম্পর্কে সে ভাল বোঝে। শ্রমিকরা কি সমস্যা নিয়ে এসেছে তা খুব সহজে বুঝে ফেলে। আগের জানাশোনা আরিফুর রহমান নামে একটি ছেলের সাথে এবছর বিয়েও করেছে। আরিফ একটি গার্মেন্ট কারখানা কোয়ালিটি কন্ট্রোলার। দুজনই গাজীপুরে বাসা নিয়ে থাকে। সব দিক বিবেচনা করে শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা তাকে গাজীপুরের এই আঞ্চলিক অফিসে নিয়োগ দিয়েছে। পাশে বসা রুমানা, শ্রমিক নেতাদের অপেক্ষায়। শ্রমিকদের কথা শুনছে। মাঝে মধ্যে দুএকটি কথাও জিজ্ঞেস করছে। ইন্দ্রানি নিজেও যখন শ্রমিকের সমস্যার সমাধান দিতে পারছে না, রুমানাকে জিজ্ঞোস করছে।
-আপা দ্যাখচেন, গার্মেন্ট মালিকরা কত্ত খারাপ। সামনে দাঁড়ানো একটি নারী শ্রমিককে দেখিয়ে ইন্দ্রানী বলে।
- এই রেখা আপা ম্যাটানিটি ছুটিতে গিচিলেন। কারখানা তকন ডাক্তারী পরীক্ষার কোন কাগজপত্র দ্যাখেনি। বলেছিল সন্তান হওয়ার পর এসে পাওনা লিও, আর চাকরি জয়েন্ড কইরো। তারপর ছুটিতে গিচে। মাঝে দুয়েকবার কারখানায় গিচে। সন্তানের মা হওয়ার পর এখুন কারখানায় জয়েন্ড করতে গিচে, বুলচে নতুন করে যোগদান করতে হবে। ছবি, কাগজপত্র নিয়ে আইসো। গত কয়েকদিন ধরে ঘুরচে। এইটা মস্ত বড় অন্যায়।
-আচ্ছা, বলে রুমানা।
-এ রকম আরও আচে। উৎসাহ নিয়ে বলে ইন্দ্রানী।
-আপনি তো জানেন। কিচু কারখানা খুব খারাপ, ইন্দ্রানী থামে।
-আপনি কি ছুটিতে যাওয়ার আগে মেডিকেল চেকাপ করিয়ে ডাক্তারের কাগজপত্র অফিসে দেখিয়েছিলেন-রেখাকেকে জিজ্ঞেস করে রুমানা।
-জি আপা দেখাইচি। কিন্তু বুইলচিছলো দেকার দরকার নাই, ছুটির পর সব দেকাবে। উত্তর দেয় রেখা।
-হুম, তারমানে হলো মাতৃকালিন পাওনা দেবে না, ছুটির পর চাকরিতে নিয়োগ দিতে দেবে না। পুরাতন পাওনা না নিয়ে নতুন করে আবার নিয়োগ দেবে,এটা জেনে শুনেই করছে। অফিসের আগের সব কাগজ-পত্র আছে তো?
-সব আছে, বলে মর্জিনা।
-তাহলে মালিক যাবে কোথায়? আপনাকে মাতৃকালিন সকল পাওনা দেবে, চাকুরি দেবে, পরে মাপও চাইবে। তবে কিছুদিন ধয্য ধরতে হবে।
-উনার কারখানাতে শ্রমিকরা সংগঠিত, আমাদের সদস্য শ্রমিকরা আছে? ট্রেড ইউনিয়ন আছে? ইন্দ্রানিকে জিজ্ঞেস করে রুমানা। ইন্দ্রানী মাথা নেড়ে নেই বলে জানায়।
-তাহলে আপনাকে মামলার পথে যেতে হবে। আপনি জিতবেন। মর্জিনা বের হয়ে যায়। আরও কয়েকজন আসে। কেউ কেউ সমস্যার কথা বলে। কেউ এমনিতেই কুশল বিনিময় করে চলে যায়। ঘড়ির কাটা নয়টা অতিক্রম করেছে। নতুন করে কেউ আসছে না। বাইরের রুমে বসে কয়েকজন গল্প গুজব করছে। ওদের কথার শব্দ ভেতরে আসছে। ভেতের রুম রুমানা আর ইন্দ্রানি।
-আপা এই বইটার কি দরকার ছিল, টেবিলের উপর শ্রম আইন-২০০৬ এর বইটি দেখিয়ে বলে ইন্দ্রানি। আগের চেয়ে কথাগুলোও বদলে যায়। শ্রমিকদের সাথে কথা বলার সময় আঞ্চলিকতার সাথে শুদ্ধ বাংলার শব্দ মিশিয়ে কথা বলছিলো। এখন পুরোপুরি বইয়ের ভাষা।
-আইনের কোন কথাই যদি মালিকরা না মানে, আইনের কথা বলতে গিয়ে যদি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়, তাহলে এই আইনের কি দরকার ছিল, প্রশ্ন করে ইন্দ্রানি।
-না আইন যেমন বর্তমানের জন্য তেমনি শত বছর পরের জন্যও, বলে রুমানা।
-আন্দোলন করে শ্রম আইন বাস্তবায়ন করতে হবে বুঝলাম। এখন যারা আন্দোলন করবে, ছাঁটায়ের শিকার হয়ে কারখানা ছাড়া হতে হবে। ফেরারি হবে হবে। কিন্তু শ্রমিকরা কি পাবে? কিন্তু এ আইন তো আরও আগে তৈরি।
-হ্যা, এ আইন আরও আগে তৈরি। শ্রম আইনের যাত্রা ব্রিটিশ প্রিয়ডে। পাকিস্তান প্রিয়ডেও কিছু আইন হয়েছে। আইনের এই বইটি সংকলন মাত্র। যা ২০০৬ সালে করা হয়েছে।
-বুঝতে পারে না ইন্দ্রানি, রুমানার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রুমে ঢুকে মতিন হক। সাথে আরও একজন। এতক্ষন মতিনের জন্যই অপেক্ষা। দুজনেরই মনোযোগ নষ্ট হয়।
নিজেরাই বাইরে থেকে চেয়ার টেনে বসে।
-সরি একটু দেরি হয়ে গেল, বলে মতিন।
-না না, ঠিক আছে, এখানেও সময় ভাল কাটছিল। যা দেখছিলাম আপনার কাছে একথাই বোধ হয় শুনতাম, জানতাম। গাজীপুরের সাথে আশুলিয়া, সাভার বা নারায়নগঞ্জের কোন পার্থক্য নেই।
-হ্যা, সব এলাকাতেই একই অবস্থা। একই শোষণ। একই মালিক। এ জন্য মালিকদের শক্তিশালী সংগঠন আছে। আমরা এক সংগঠনের সাথে আরেক সংগঠন, এক এলাকার সংগঠনের আরেক এলাকার সংগঠনের শক্তিশালী সংযোগ করতে পারছি না। এমন কি একই সংগঠনের এক ইউনিটের সাথে আরেক ইউনিটের কার্যকর সংযোগ নেই। মালিকদের নানা কৌশলের কাছে শ্রমিকদের অধিকারের আন্দোলন মার খাচ্ছে।
মতিনের উচ্চ¯^রের কথাতে বাইরে অপেক্ষমান শ্রমিকরাও দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমিনও এসে গেটের কাছে দাঁড়ায়। একজন শ্রমিক আমিনকে একটি চেয়ার দেয় বসতে। একে এক অন্যরা একটি একটি করে চেয়ার নিয়ে এসে দরজার সামনে লম্বা হয়ে বসে। বাইরে থেকে কথা শোনে।
-আমি তো বক্তব্য দেওয়া শুরু করে দিলাম। আপনারা শ্রম আইন নিয়ে কি যেন বলছিলেন, মতিন বলে।
-না না বলেন, বলে রুমানা।
-দুটি বিষয়ই আমার জানার দরকার। তবে রুমানা আপা শ্রম আইনের গোড়ার কথা শুরু করেছিল।
-ঠিক বলেছো ইন্দ্রিয়া। মতিন বুঝে ফেলে রুমানার কথা শোনার সমর্থন আছে। আগে রুমানার কথাটাই শোনা দরকার। ইন্দ্রানি ছোট্ট হলেও তার মতামতকে মূল্য দিতে হবে।
মতিন ইন্দ্রানিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের মহান বন্ধু ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিয়া গান্ধীর সাথে মিল রেখে ইন্দ্রিয়া বলে ডাকে। ইন্দ্রানিও মজা পায়, নতুন নামে রাগ করে না।
-জি আপা বলেন, রুমানাকে ইঙ্গিত করে বলে ইন্দ্রানি।
-হ বলেন. মতিনও সমর্থন দেয়।
-হ্যা, যে কথা বলছিলাম। শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়োগপত্র, ছুটি, ওভারটাইমের টাকা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেওয়া, মুনাফার পাঁচ ভাগ শ্রমিককে দেওয়াসহ আইন অনুযায়ী প্রাপ্য গার্মেন্ট কারখানাতে এখন স্বপ্নের মত। শ্রমিকদের ডর্মেটরি গার্মেন্ট কারখানাতে ভাবাই যায় না। কিন্তু এ সবই এক সময় এই দেশেই ছিল। সেই সময়ে যে সব কারখানা এখনো আছে সেখানে এখনো এরি কছুটা কার্যকর আছে।
-আপা কি বলেন, বলে ইন্দ্রানি।
-হ্যা, স্বাধীনতা পুর্ববর্তি এদেশে যতগুলো কারকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সবগুলোতে এ শ্রমিকদের এসব অধিকার ছিল। স্বাধীনতার পরেও অনেক কারখানায় এ ধরনের সুযোগ সুবিধা ছিল। এখনো যেসব কারখানা অবশিষ্ট আছে এ গুলোতে প্রায়ই শ্রম আইন অনুযায়ী চলে।
-তার মানে স্বাধীনতা পেয়ে আমরা আমাদের অধিকার হারিয়েছি, স্বাধীনতা আমাদের খারাপ করেছে ? তাহলে এই স্বাধীন দেশ কার? মুখোবয়বের ভাজগুলো শক্ত হয় ইন্দ্রানীর। অন্যদেরও চোখের তারার পরিবর্তন আসে। তবে আমিন বা মতিনের অভিব্যক্তিতে কোন পরিবর্তন আসে না। রুমানা নিজে পুকুরের শান্ত পানির মত স্থির হয়ে অন্যদের চোখে-মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে।
-এ স্বাধীন দেশ আমাদের। এদেশের আলো, বাতাশ সব আমাদের। স্বাধীনতা আমাদের সব চেয়ে বড় অর্জন। এ অর্জনের সাথে কোন অর্জনের কখনো তুলনা হবে না। স্বাধীনতা পেয়েছি বলে আমাদের শাসন আমরাই করি, বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা, আর্মির জেনারেল সব আমাদেরই দেশের মানুষ, আমাদের যে গার্মেন্ট তৈরি করি তা বিদেশে বিক্রি হয়ে আমাদের দেশে টাকা আসে। আগে পাট বিক্রি কওে সব পাকিস্তানে যেত। আমার প্রবাসি ভাইবোন যারা বিদেশে টাকা রোজগার করে তাদেও টাকা এদেশেই আসে। আমরা গবেষণা করে কৃষককে সাথে করে নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করি। যখন স্বাধীনতা ছিল না, তখন এ সবের চিন্তাই করা যেত না। এখন সরকার বদল করতে চাইলে আমরা আন্দোলন করি; আমাদের চাওয়া মত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। এটাই তো স্বাধীনতা।
-তা হলে শ্রম আইন, প্রশ্ন করে দরজায় বাইরে থাকা এক শ্রমিক। সেখানে আমিনও বসা। রুমানা দরজার দিকে মুখ ফেরায়, আমিন মাথা ঝাকিয়ে উৎসাহ দেয়।
-হ্যা, শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর যে নিম্মমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম হয়েছে তারা শ্রমিকদের স্বাধীনতার ফসল লুট করে নিয়ে গেছে, ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। জীবনের ঝুকি নিয়ে যে শ্রমিক যুদ্ধে গেল, কারখানা পাহারা দিল স্বাধীনতার পর সে শ্রমিক স্বাধীনতার ফসল ঘরে তুলতা পারলো না। একই সাথে স্বাধীনতার যে আকাক্সখা শোষনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা তা ব্যহত হলো। একটি শ্রেণি ফুলে ফেঁপে বড় লোক হলো। বঙ্গবন্ধু চব্বিশ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, এখন ২৪ হাজার পরিবারের জন্ম হয়েছে দেশে।
এটা স্বাধীনতার দোষ নয়। শাসক শ্রেণি হয়তো আমাদের রক্ষা করতে পারেনি। তবে সে সময় দেশি বিদেশি স্বাধীনতা বিরোধী চক্রও আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারপরও এটা আমাদের দোষ, আমাদের মত শ্রমিকের দোষ। আন্দোলন করে, সংগ্রাম করে আইনি পথে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারলে আমাদের জীবনমানের পরিবর্তন হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী অধিকার ফিরে পাবো।
কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে রুমানা।
-ওই সব কারখানার মালিক যদি শ্রমিকরে ন্যায্য পাওনা দেয়, শ্রম আইন মেনে চলে শ্রমিকদেরও জীবন মানের উন্নতি হয়। শোষণ কমে। টাকা পাচার করে কানাডায় বেগমপাড়ায় বাড়ি কিনতে পারে না, মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় হোমও ক তে পারে না। দেশেরও সুসম উন্নয়ন হয়। কিন্তু তারা কিছুই দেবে না। আমাদের অধিকার আমাদের আদায় করতে হবে।
মতিন ইশারা করে কথা বন্ধ করতে বলে রুমানা। রুমানা কথা বন্ধ করে দিয়ে মতিনকে অনুসরণ করে। মতিন রুমানার কানে কানে বলে, ‘ঝুট মাস্তানরা খুই খুই করে বেড়ায়। ওরা জানতে পারলে পুলিশকে খবর দিবে। আর পুলিশ না বুঝেই এসে ঝামেলা পাকাবে। এ সব কথা বলার জন্য আমাদের অন্য একটি মেসে জায়গা করা আছে, সেখানে যাবো। এখন উঠবো এখান থেকে।’ অন্যরা কিছুই বুঝলো না।
-বন্ধুরা আপনাদের সাথে কথা হলো। আজকের মত এখানে শেষ করতে হচ্ছে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতার দিকে যেতে থাকে রুমানা। ইন্দ্রানি বিষয়টি বুঝতে পারে। আগে কয়েকদিন পুলিশ হামলা করেছিল। সাদা পোশাকের আইন শৃক্সখলার বাহিনীর লোকজনও আসে। আশে-পাশে কোন কারখানাতে আন্দোলন হলেই এ অবস্থার সৃস্টি হয়। মালিকের ভাড়াটে লোকজন তো পেছনে লেগেই আছে। শ্রমিকরা কোন অভিযোগ জানাতে এলে সাথে সাথে মাস্তানও আসে, বাইরে ঘুরা ফেরা করে। এ জন্যই হয়তো মতিন ভাই রুমানাকে থামতে বলেছে। তাছাড়া কোন নেতা সাংগাঠনিক কাজে এলে এখানে খানিক বসে। তারপর কোন ম্যাচ বা কোন শ্রমিকের বাসায় চলে যায়, সেখানে আলাপ হয়।
বাইরে থেকে রুমানার কথা শোনার আগ্রহের কথা জানায় শ্রমিকরা।
-এখন নয়, রাত হয়ে গেছে। এখন অফিস বন্ধ করতে হবে, বলে মতিন। কেউ কেউ কাছে এসে একদিন ম্যাচে এসে কথা বলার আমন্ত্রণ জানায় রুমানাকে। একে একে শ্রমিকরা বের হয়ে যেতে থাকে। ইন্দ্রানি খাতাপত্রগুলো গোছানো শুরু করে। রুমানা কোন ম্যাচে বসবে ইন্দ্রানিকে ইঙ্গিত করে আমিন। তারপর উঠে দাঁড়ায় রুমানা ও আমিন। তাদের অনুসরণ করে মতিনের সাথে আসা শ্রমিক বন্ধুটি। পাশাপাশি হাটতে শুরু করে মতিন ও রুমানা। অন্ধকার পথ। পথের পাশের বাড়ি থেকে বিজলি বাতির একফালি আলো রাস্তার যেখানটায় পড়ে স্পষ্ট বোঝায় যায়। যেখানে আলো পড়েনি অন্ধকারটা গভীর আকার ধারণ করে। এই আলো আঁধারির পথ হেটে চলে চারজন।
- বেশ তো হলো। এবার গাঁট-সাট বেঁধে ফেলেন। শ্রমিকের জন্য জীবনটা দিয়ে দিলেন। ব্যাচারিও আপনার জন্য চিরকুমার থেকে গেল। তিনিও তো শ্রমিকের সাথে সাথে আছে। পেছনে আসা আমিনকে ইঙ্গিত করে বলে মতিন।
- গাঁট-সাট তো বেঁধেই ফেলেছি। ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাধনে’ সুর করে গাইতে গাইতে হেসে ফেলে রুমানা। হেয়ারিং করা পথে ইটে হোচট খায় রুমানা। মতিন ধরতে যায়। ততক্ষণ নিজেকে সামলে নেয় রুমানা। পড়তে পড়তে সামনে কয়েক ধাপ এগিয়ে যায় সে। আমিন বুঝে ওঠার আগেই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
সেই ২০০৫ সাল থেকে আমিন রুমানার জানা শোনা। ওর বয়সি মেয়েরা গার্মেন্ট কারখানা প্রথম চাকরি নেওয়ার পর অভিযোজন করা কঠিন হয়। এক-কোন মতে চাকরিটি ধরে রাখার জন্য সুপারভাই-ম্যানেজারদেন অত্যাচার সয্য করে থাকতে হয়; না হয় নিজে শক্তি ধরে প্রতিবাদ করে টিকে থাকতে হয়। রুমানা শেষের দলের মেয়ে ছিল। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই কাজের সন্ধানে পাবনা থেকে ঢাকায় এসেছিল। সেই থেকে আমিন রুমানার ছায়ার মত লেগে আছে। বিপদে-আপদে, সুখে-দুখে একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে চলে। বাইরের লোক কেউ ভাই বোন মনে করে, কেউ স্বামী-স্ত্রী মনে করে।

(অতপর)



Comments





Pakkhik Sramik Awaz
Reg: DA5020
News & Commercial:
85/1 Naya Paltan, Dhaka 1000
email: sramikawaznews@gmail.com
Contact: +880 1972 200 275, Fax: +880 77257 5347

Legal & Advisory Panel:
Acting Editor: M M Haque
Editor & Publisher: Zafor Ahmad

Developed by: Expert IT Solution